প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে যশোরের গদখালী ফুলবাজারের ব্যবসায় ধস নামে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ও ২৬ মার্চ একদমই ফুলের বেচাকেনা হয়নি বাজারে। তবে বুদ্ধিজীবী দিবস ১৪ ডিসেম্বর ও বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর ঘিরে ফুলের ব্যবসা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে চাষীদের মধ্যে।

মূলত বিভিন্ন দিবস ঘিরে যশোরের গদখালী ফুলবাজার জমে ওঠে। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত ফেরুয়ারি ও মার্চে কোনো ব্যবসা করতে পারেনি চাষী ও ব্যবসায়ীরা। তার ওপর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। তখন চরমভাবে লোকসানে পড়েন ফুল চাষের ওপর নির্ভরশীল এলাকার কয়েক হাজার মানুষ।

যশোর শহর থেকে ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় নানা জাতের ফুল। ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার গ্রামগুলোর রাস্তার দুপাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার দেখা যায়। প্রতিদিন ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারার শত শত ফুলচাষীর আনাগোনা শুরু হয় গদখালীর বাজারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছোট-বড় পাইকাররাও সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান।

করোনা পরিস্থিতি আসার আগে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠত গদখালীর ফুলের বাজার। কিন্তু বছরের বেশি সময় ধরে সেই দৃশ্য আর নেই। পুরো বাজার এলাকা যেন জনমানবশূন্য। নেই আগের মতো ফুলের দাম নিয়ে হাঁকডাক। চাষীদের চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির (বিএফএস) সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, এবার ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। গত বছর করোনার কারণে কেউ ব্যবসা করতে পারেননি। গদখালী অঞ্চলে পাঁচ হাজার কৃষকের মধ্যে ৫৫ জন সরকারের প্রণোদনা ঋণ পেয়েছেন। বাকিরা এনজিও ঋণ ও অনেকে জমি বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘করোনাভাইরাস ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ফুল ব্যবসা অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে এবারের ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বর অন্তত ৫০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ে ২ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হতো।

গদখালী হাড়িয়া গ্রামের ফুলচাষী রহমত গাজী বলেন, আড়াই বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছিলাম। প্রতি পিস ৪ টাকা করে বিক্রি করেছি। এতে সামান্য লাভ হয়েছে।

ঝিকরগাছার পটুয়াপাড়া এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘করোনাভাইরাসে ফুল বিক্রি না হওয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ি। চলতি মাসের দুই দিবসে ভালো ফুল বিক্রি হয়েছে। রজনীগন্ধা ১০০ পিস ৮০০ টাকা, জারবেরা প্রতি পিস ১২ টাকা, গাঁদা ফুল ১ হাজার পিস ৫০০ টাকা, গ্লাডিওলাস ১০০টি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

যশোর ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুম হোসেন পলাশ জানান, উপজেলার গদখালীতে এবার সাড় ছয় হাজার হেক্টর জমি ফুলের আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু মহামারী করোনা ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে সব ফুলচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু চলতি মাসে ভালো ফুল বিক্রি হয়েছে বলে জেনেছি।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচারক বাদল চন্দ্র জানান, করোনায় ফুলচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চলতি মাসে তাদের ভালো ফুল বিক্রি হয়েছে। এরই মধ্যে ফুল চাষে জড়িত ৩০০ চাষীর মাঝে বিনা মূল্যে আউশের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০০ কৃষকের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছি।