প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, যে তরুণ পথে নেমে এসেছে, যে যুবক কাজ ফেলে রাজপথে নেমেছে, যে বাবা ছেলেকে মিছিলে পাঠিয়ে প্রার্থনায় বসেছে, যে শ্রমিক প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তাদের সবার কাছে আমাদের অনেক ঋণ। আর সে ঋণ-ই 'জুলাই সনদ'। এর প্রতিটি অক্ষর কালো কালিতে লেখা হলেও এর পটভূমি রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে। রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষরই জুলাই সনদ।
আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আর কোনো স্বৈরাচার যাতে জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, জনগণের অধিকার পদদলিত করতে না পারে, কাউকে গুম করতে না পারে, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে- সে জন্য 'জুলাই সনদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে জয়যুক্ত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর যারা ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনে থেকে মুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জীবন বিসর্জন করেছেন, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, গ্রেফতার-নির্যাতন ভোগ করেছেন, তারা আমাদের কয়েকটি দায়িত্ব সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে, ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যেন আর ফিরে আসতে না পারে, সেই পথ রুদ্ধ করা। আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথনকশা নির্মাণ। দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। আগামী অন্তত ৪০ বছর আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কোন পথে যাবে, আমার ও আপনার দায়িত্ব হচ্ছে সে পথ নির্ধারণ করা।
অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করার জন্য জাতীয় সংসদের একটি কমিটি করা হয়েছিল। তাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের সদস্যরা ছিল না। সেই কমিটি ২৫টি বৈঠক, ১০৪ জন ব্যক্তির মতামত নিয়ে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে। তবে কিছু শর্ত আরোপ করা হবে। যেমন ৯০ দিনের বেশি এটা থাকতে পারবে না। বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে পারবে না। একটা বৈঠকে সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। সেই বৈঠকটা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পঞ্চদশ সংশোধনী তৈরি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে এক ব্যক্তির ইচ্ছায়। সংবিধান সংশোধনী আর যাতে ছেলেখেলায় পরিণত না হয় সেটা বন্ধ করা সময়ের দাবি।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিন তিনটি তামাশার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ২০১২ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নামে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি 'সার্চ কমিটি' নামে একটি 'নাটক' মঞ্চস্থ করেছিল। বলা হয়েছিল, 'সার্চ কমিটি'র সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন। কিন্তু জানা গেছে 'সার্চ কমিটি’র সুপারিশে 'কাজী রকিব উদ্দিন' নামক কোনো ব্যক্তির নাম ছিল না। এক ব্যক্তির ইচ্ছাতেই এটি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল।
মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ গণভোটে আসছে চারটি ক্যাটাগরিতে। চার ক্যাটাগরিতে ৪৮টি সুপারিশ থাকলেও কার্যত প্রশ্নটি একটাই। সেটি হলো-আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে?
তিনি বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে এবং সেটি কতটা বীভৎস আর নির্মম ও নৃশংস হতে পারে সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র তৈরি করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গত ৫৪ বছরে সেই রাষ্ট্র আমরা পাইনি। বরং এ দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিশেষ আমাদের স্বাধীনতাকে অ্যাবিউজ করেছে নিজেদের হীন স্বার্থে। এবার জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেই লক্ষ্য অর্জনের। এখন গণভোটের মাধ্যমে এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এতে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।










