হবিগঞ্জে গড়ে ওঠা অধিকাংশ শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নেই। কোনো কোনো কারখানায় ইটিপি থাকলেও তা চালু করা হয় না। শিল্প-কারখানার নানান বর্জ্য সরাসরি ফেলা হয় আশপাশের জলাশয়ে। এসব বর্জ্যের কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে হবিগঞ্জের সুতাংসহ কয়েকটি নদী।
সম্প্রতি সরজমিনে দেখা গেছে, সুতাং নদীর পানি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক স্থানের পানি কুচকুচে কালো। এ কারণে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না তীরবর্তী বাসিন্দারা। নদীতে এখন আর মাছ নেই। নদীর বিষাক্ত পানি পান করে মারা যাচ্ছে হাঁস-মুরগি। আশপাশের লোকজনের শরীরে দেখা দিচ্ছে রোগবালাই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে সুতাং নদীর উৎপত্তি। চুনারুঘাট উপজেলার ওপর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নদীটি। পরে শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে লাখাই উপজেলার ওপর দিয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। এছাড়া অলিপুর শিল্প এলাকা থেকে বয়ে গেছে শৈলজুড়া ভাটি খাল। অলিপুর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পার হয়ে এ খাল মিলেছে গোড়াবই গ্রামে সুতাং নদীতে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় সুতাং নদীতে বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় লোকজন নৌকা নিয়ে দলবেঁধে মাছ ধরেছে। সে সময়ে শুকনো মৌসুমেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন এ ধারা পাল্টে গেছে।
হবিগঞ্জের পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন তিনটি সংগঠন সম্প্রতি শিল্প-কারখানার বর্জ্যে নদীর পানি দূষণ পর্যবেক্ষণ করছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিভিন্ন শিল্প এলাকা পরিদর্শন করেন খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কর্মকর্তারা। তারা মাধবপুর উপজেলার রতনপুর-ছাতিয়াইন সড়কে গুপলপুরের পাশে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাতিয়াইন খালে ছেড়ে দেয়া অপরিশোধিত বর্জ্য দেখতে পান। এ সময় তারা খালের পানির ওপর বর্জ্যের গাঢ় স্তর ও ওপরে বুদ্বুদ উঠতে দেখেন।
অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ফজলুর রহমান জানান, ছাতিয়াইন খালের বর্জ্য খড়কি গাঙ হয়ে এক অংশ তিতাস নদীতে এবং অন্য অংশ খাষ্টি ও মেঘনা নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় খালটি স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ছাড়াও এলাকার কৃষকদের জমিতে সেচকাজে ব্যবহার করা হতো, যা বর্তমানে অকল্পনীয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘গ্লোরি এগ্রো প্রডাক্ট নামের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিয়ত তরল বর্জ্য ছাতিয়াইন খালে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যের দুর্গন্ধে রাস্তায় চলাফেরাসহ বাড়িঘরে বসবাস করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।’
পরিবেশকর্মী আব্দুল কাইয়ুম জানান, রতনপুর থেকে আট কিলোমিটার দূরবর্তী পিয়াইম গ্রামের সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত অন্য একটি খালে বর্জ্যবাহিত একই রঙের কালো পানি দেখতে পান। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরবর্তী উচাইল সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত সুতাং নদীতেও কালো পানি দেখতে পান। শৈলজুড়া খাল দিয়ে দূষিত শিল্প বর্জ্য সুতাং নদীতে ফেলায় নদীটি বর্তমানে দেশের মারাত্মক দূষিত তিনটি নদীর একটি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ নদীর দূষিত পানি বলভদ্র ও মেঘনা নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি আরো জানান, আরো কয়েকটি কোম্পানি আশপাশের খাল দূষণ করছে। এর মধ্যে সাবান তৈরি করে—এমন কোম্পানি রয়েছে দুটি। পাশাপাশি সায়হান নিট কম্পোজিটের বর্জ্য ছাতিয়াইন খালে পড়ে। যমুনা ফিউচার কোম্পানির বর্জ্য বেজোড়ার খাল হয়ে খাষ্টি নদীতে পড়ে। ডেনিম পাইওনিয়ার গার্মেন্টসের বর্জ্য বোয়ালিয়া বিল হয়ে বলভদ্র নদীতে পড়ে। এর দুটি নালা তিতাস ও মেঘনা নদীতে পড়ে।
ছাতিয়াইন খাল ছাড়াও বর্জ্যে দূষিত ফকিরা খাল, রাজখাল, খড়কি গাঙ ও সুতাং নদীর পাশের এলাকার মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আশিক মিয়া বলেন, ‘কোম্পানিকে দূষিত বর্জ্য খালে না ফেলার জন্য অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
অন্যদিকে গ্লোরি এগ্রো প্রডাক্ট লিমিটেডের পরিচালক সারোয়ার আহমেদ বলেন, ‘খালের পানি নষ্টের জন্য আমরা দায়ী নই। একটি গোষ্ঠী শত্রুতাবশত কোম্পানির পেছনে লেগেছে। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় জলাবদ্ধ হয়ে পানিতে দুর্গন্ধ হচ্ছে।’
বাপা হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘আশির দশকে এ অঞ্চলে শিল্পায়ন শুরু হলেও এক দশক ধরে এটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। কৃষিজমি, গ্যাস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজলভ্য হওয়ায় হবিগঞ্জ জেলায় শতাধিক কলকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদী, খাল, জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে।’
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম ফয়সল বলেন, ‘গ্লোরি এগ্রো প্রডাক্টের বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। এরই মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ কার্যালয়ের উপপরিচালক আক্তারুজ্জামানন টুকু বলেন, ‘গ্লোরির বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করেছি। পরীক্ষায় পানি দূষণের আলামত পাওয়া গেছে। আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছি বিভাগীয় কার্যালয়ে। বাকিটা তারা ব্যবস্থা নেবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, ‘গ্লোরির বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান চালিয়ে বড় অংকের টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এখন একটা লিখিত আমরা পেয়েছি, মামলা প্রক্রিয়াধীন।’










