দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন জানিয়েছেন তার কাছে বর্তমানে ব্যাংক এবং হাতে নগদ মিলিয়ে মোট সাড়ে চার লাখ টাকা আছে। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমার সম্পদ বিবরণী দুদক সংস্কার কমিশনের কাছে জমা দিয়েছি। অন্য কমিশনাররা তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দিয়ে দেবেন।

রোববার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি নিজের আয়-ব্যয় ও সম্পদের ফিরিস্তি জানান। সভায় দুদকের অতীত ও বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেন সাংবাদিকরা।

নিয়োগ পাওয়ার একদিন পরই গত ১১ ডিসেম্বর কর্মস্থলে যোগ দেন মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। ওইদিন সাতদিনের মধ্যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ওইদিনই দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিবরণীর তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করে যাবে দুদক।’

দুর্নীতির ব্যাপকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে এ প্রথম, কোনও গণঅভ্যুত্থানের পর গণরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে (বায়তুল মোকাররম) মসজিদের ইমাম পর্যন্ত পালিয়ে গেছেন। ছাত্রজনতা সেটা করে দেখিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি যে একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও বায়তুল মোকাররমের ইমাম পালিয়েছেন। এটি একটি অদ্ভূত ঘটনা। অনেক দেশেই আন্দোলন হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধান পালিয়ে গেছেন, প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন। কিন্তু পোপ বা মন্দিরের পুরোহিত পালিয়ে গেছেন, এমনটি ঘটেনি। এরকম অবিশ্বাস্য ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরো তথ্য পেলে সাংবাদিকদের জানানো হবে।’

রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের ধরা হয় না এ মন্তব্যটা মোটেও অসমীচিন নয় বলেও মন্তব্য করেছেন দুদক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন ‘আমাদের প্রত্যাশা অনেক সময় সফল হয় না। কারণ, হয়তো আমরা যে মামলাটা করি সেই মামলাটাই দুর্বল। সুবিচারের দায় যে শুধু দুদকের সেটাও নয়, এটার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবাইকেই নিতে হবে। ন্যায় বিচার শুধু শাস্তি নয়, ছাড় পাওয়াও ন্যায়বিচার। অপরাধ প্রমাণিত না হলে তো ছাড়া পাবেনই।’

পুলিশ মামলা করে সত্য উদঘাটন করে আর দুদক সত্য উদঘাটন করে মামলা করে। তার মানেই হচ্ছে দুদক সত্যতার প্রমাণ পেয়েই মামলা করে। অর্থাৎ, সে মামলাগুলো আদালতে টেকারই কথা। সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। নিজের সম্পত্তির ফিরিস্তি তুলে ধরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বসিলায় সাড়ে সাতশো স্কয়ার ফিটের দুটি মিলিয়ে ১৫০০ স্কয়ার ফিটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সেখানে আরো ৭০০ স্কয়ার ফিট নেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। পূর্বাচল আমেরিকান সিটিতে স্ত্রীর সঙ্গে আমার একটি খালি জায়গা আছে পাঁচ কাঠার। বিসিএস প্রশাসন কমিটির সদস্য ছিলাম, সেখানে আটজন সদস্যের জন্য ১০ কাঠা জমি আছে। আমার ভাগে ১ দশমিক ২৫ কাঠা পড়বে। ২০০৭ সালে টাকা-পয়সা দিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত দখল পাইনি।

তিনি বলেন, রাজউকের একটি প্লটের জন্য ৭৫ হাজার টাকা জমা দিয়েছিলাম। আজ পর্যন্ত সেটির কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। যে কোনো কারণে হোক সরকার আমাকে দেয়নি। আমি আবার আবেদন করব। এর বাইরে আমার আর কোনো স্থাবর সম্পদ নেই।

অস্থাবর সম্পদের বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বিভিন্ন আকারের ২৫টি সেলফ ভর্তি বইপত্র আছে। অনেক দামি বইপত্র আছে। আসবাবপত্র ইলেকট্রনিক সামগ্রী মিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকার জিনিস আছে। পাঁচ বছর মেয়াদি ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। আর তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্র আছে ২০ লাখ টাকার। আমার জিপিএফের টাকা আমি তুলি নাই, ওখানে ১৭ লাখ টাকা আছে।

নিজের আয়ের উৎস সম্পর্কে জানিয়ে তিনি বলেন, আমার চাকরিলব্ধ আয়- উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ। শিক্ষকতা করি, বক্তৃতা করি, লেখালেখি করি। সাড়ে পাঁচ শতক একটা জমি কিনেছিলাম বেড়িবাঁধের বাইরে, সেটি বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়েছিলাম।

তিনি বলেন, আমার চাকরিজীবন অনেক দিনের। ছাত্রাবস্থা থেকেই আয় করা শুরু করি। যখন এ চাকরি থেকে চলে যাব আপনারা হিসাব করবেন এ সম্পদ কতটা বাড়ল, কতটা কমল।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের সৌভাগ্য আমরা এমন সময় এসেছি যখন রাজনৈতিক সরকার নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণপ্রত্যাশাকে লালন করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ এ সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এ সরকার প্রতিষ্ঠা না হলে, ৫ আগস্টের বিপ্লব না হলে আমরা এখানে আসতাম না।

এ সময় দুদক কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী বলেন, মাত্র অর্ধেক জনবল নিয়ে দুদক কাজ করছে। আমরা নির্মোহভাবে অনুসন্ধান করব। কোথাও পক্ষপাত হবে না। আমরা জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মতবিনিময় সভায় কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদও বক্তব্য রাখেন। দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মোঃ আক্তার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।