মাছের রাজধানীখ্যাত হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। হাওরের মাছ সুস্বাদু হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে দেশী মাছের চাহিদা রয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে হাওরের মাছ। তবে দেশী মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া, করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম না থাকায় প্রতি বছরই কমছে হাওরের মাছ রফতানি। যদিও চলতি বছর ১০ সেপ্টম্বর পর্যন্ত ২৫৮ টন মাছ রফতানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য ১৩ কোটি টাকা।

ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাআইদৌলা (প্রা.) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৪০ টন মাছ রফতানি হয়েছে। যার বাজার মূল্য ১৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১০ টন রফতানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য ১৪ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ২৫৮ টন মাছ রফতানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য ১৩ কোটি টাকা।

হাওরের বোয়াল, রুই, আইড়, মেনি, বাচা, কাঁকিলা, লাচো, কাজলি, চেলাপাতা, বাইম ও রানী মাছ রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউকে, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ইতালি ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে।

ইউরো ফুডস গ্রুপ বাংলাদেশ অপারেশনসের নির্বাহী পরিচালক শাহ আছাদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ কোটি এবং চলতি বছরে ইতিমধ্যে ১৩ কোটি টাকার মাছ রফতানি করেছি ইউএসএ এবং ইউরোপে। তবে সুনামগঞ্জে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান থাকায় দেশের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত আমরা। সঠিক বিদ্যুৎ সরবরাহ না হওয়ায় মাছের বাজারজাত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া দেশী মাছ দিন দিন কম পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদামতো মাছ পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। তাই দ্রুত দেশী প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার তথা কর্তৃপক্ষের নজর বাড়ানো দরকার।’

সাআইদৌলা (প্রা.) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মানবসম্পদ ও পাবলিক রিলেশন ব্যবস্থাপক শেরওয়ানুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুনামগঞ্জের হাওরের মাছ ইউরোপ-ইউএসএসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা রফতানি করছি। আন্তার্জাতিক বাজারে মেনি, বাচা, কাঁকিলা, লাচো, কাজলি, চেলাপাতা ও রানী মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় কাঁচামালের ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী রফতানি করতে পারছি না।’

রফতানি কমে আসার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দেশী মাছের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এসব দেশের মাছ বাংলাদেশের মাছের বাজার দরের চেয়ে অর্ধেক দামে বিক্রি করায় প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। এদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে দেশী মাছ রফতানির ক্ষেত্রে সরকারের প্রণোদনার হার বৃদ্ধি প্রয়োজন। অন্যদিকে করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈশাখ (এপ্রিল-মে) ও  জ্যৈষ্ঠ মাস (মে-জুন) হলো দেশীয় মাছের প্রজননের প্রকৃত সময়। মা-মাছ নতুন পানিতে ডিম ছাড়বে, সে ডিম রোদের তাপে ও পানির হালকা ঢেউয়ে রেণু হয়ে পোনায় রূপান্তর হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সময়মতো হাওরে পানি না থাকায় মা-মাছ প্রজনন করতে পারছে না। ফলে হাওরে দেশী প্রজাতির মাছ কমে যাচ্ছে। সময়মতো মাছের প্রজনন না হওয়ায় এবার লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে না। এবার প্রায় ৪০ হাজার টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা মৎস্য বিভাগ।

হাওর এরিয়া আপলিস্টম্যান্ট সোসাইটি হাউসের নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাওরে চায়না জাল দিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে মাছের পোনা। হাওরের জেলেদের মা ও পোনা মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে পারলে বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাবে। হাওরে উৎপাদিত ধানের যেমন সুরক্ষা প্রয়োজন, মৎস্য সম্পদেরও তেমনি সুরক্ষা প্রয়োজন। হাওরের রাজধানীখ্যাত সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কৃষক বোরো ফসল গোলায় তোলার পরপরই বিকল্প কর্ম হিসেবে মাছ ধরতে ব্যস্ত হন। কারণ তাদের বিকল্প কর্ম নেই। এ সময়টা জেলেদের পুনর্বাসন করা দরকার।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামছুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার জেলায় আমরা প্রায় ৪০ হাজার টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। সময়মতো হাওরে পানি না হওয়ায় মাছের প্রজননে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। জেলার সব উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রতিনিয়ত মা-মাছ ও পোনা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। মা ও পোনা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে জেলেদের পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। সাআইদৌলা (প্রা.) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছ রফতানি করছে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনীতিতে ভালো ভূমিকা রাখবে এ প্রতিষ্ঠানটি।’