দেশে গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি যায় বিদ্যুৎ খাতে। উল্লেখযোগ্য একটা অংশ যায় সার কারখানাগুলোয়। এ দুই খাতে গ্যাস সরবরাহ বাবদ পেট্রোবাংলার পাওনা ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে। সম্প্রতি এ অর্থের ৫০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বিপিডিবি। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, যে অর্থ ফেরত আসছে, তা পাওনার তুলনায় খুবই সামান্য। প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওনা আদায় করা গেলে গ্যাস আমদানি ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো জোরদার করা যেত।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে জ্বালানি বিভাগের বৈঠকে পাওনা আদায়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিপিডিবির ৫০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা পেট্রোবাংলার পাঁচটি বিতরণ কোম্পানিকে পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনকে (টিজিটিডিসিএল) ১০০ কোটি, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (জেজিটিডিএসএল) ২৪২ কোটি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (কেজিডিসিএল) ৬৮ কোটি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডকে (পিজিসিএল) ৪২ কোটি এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডকে (এসজিসিএল) প্রায় ৫১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

গুরুত্ব বিবেচনায় সার ও বিদ্যুতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। বিদেশ থেকে উচ্চ মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হলেও ঠিকমতো বিল পাচ্ছে না পেট্রোবাংলা। দীর্ঘদিনের বকেয়া ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। 

এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বকেয়া আদায়ের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির সঙ্গে গত মাসের শেষ সপ্তাহে বৈঠক হয়। কিন্তু বকেয়ার বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের বকেয়া আদায়ের বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। বকেয়া আদায়ে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে তিনজন যুগ্ম সচিবের পাশাপাশি দুজন উপসচিবও নিযুক্ত করা হয়েছে, যারা বকেয়া আদায়ে তদারকি করবেন।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপিডিবি ও সার কারখানাগুলোর কাছে বড় পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে বিপিডিবির অর্থ আমরা পাচ্ছি। তারা বিল পরিশোধ করছে। কিন্তু সেটি পাওনার তুলনায় খুবই সামান্য। বকেয়ার বড় অংশ পাওয়া গেলে পেট্রোবাংলার গ্যাস আমদানি ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো জোর পাবে।’

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১১ হাজার ৭০৮ মেগাওয়াট, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪৫ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বেসরকারি ২৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১১টি আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাস ব্যবহার করে। ছোট আইপিপি (এসআইপিডি) রয়েছে চারটি। এছাড়া তিনটি কুইক রেন্টাল ২২৬ মেগাওয়াট এবং দুটি রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাস দিয়ে মোট ৪১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বেশির ভাগ কেন্দ্রই নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। 

অন্যদিকে দেশে সরকারি-বেসরকারি সার কারখানা রয়েছে ছয়টি। এসব কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ হয় ১১৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানির চাহিদা দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট, ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির চাহিদা ৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিএল) গ্যাসের চাহিদা ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট, চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানির (সিইউএফএল) চাহিদা ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের চাহিদা ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বেসরকারি কাফকোর চাহিদা ৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ ৩ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে পূর্ণ সক্ষমতায়। অর্থাৎ ১ হাজার ৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সরবরাহের ১ হাজার ২৪২ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ পাচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো।

গত ৮ মার্চ এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, পেট্রোবাংলার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বকেয়া ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। 

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি পর্যন্ত পেট্রোবাংলার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বকেয়ার পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।