সাম্প্রতিক সময়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের প্রাপ্যতা নিয়ে সংকটের যে অভিযোগ উঠেছে, তার পেছনে প্রকৃত কোনো সরবরাহ ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সাময়িক সংকট আমদানি বা উৎপাদনে কোনো ব্যর্থতার কারণে নয়; বরং পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশের ‘যোগসাজশ ও পরিকল্পিত কারসাজির ফল’।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা জানান।
উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশে এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। সরকারের সম্পৃক্ততা মাত্র প্রায় ২ শতাংশ, যেখানে প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করে বোতলজাত করা হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)- এর সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়কে কেন্দ্র করে কিছু বেসরকারি অপারেটর ভোক্তাদের সুযোগ নিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এলপিজি বাজারে যেকোনো ধরনের কারসাজি রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ মূলত বিইআরসির হাতে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জ্বালানি সচিব ও বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং পরে জ্বালানি সচিবের সঙ্গে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি জানান, আগের মাসের তুলনায় এলপিজি আমদানি বেড়েছে, যার ফলে সরবরাহের কোনও প্রকৃত ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আমদানির দিক থেকে সংকটের কোনো কারণ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিইআরসির সাম্প্রতিক সমন্বয়ের পর কিছু অপারেটর উচ্চ মূল্যের প্রত্যাশায় সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকার বেশি দামে সাম্প্রতিক বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের শোষণ করছে। এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি যোগসাজশের মাধ্যমে করা হয়েছে, এটি স্বাভাবিক বাজারচক্র নয়।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, মজুদদারি, জোরপূর্বক দোকান বন্ধ এবং কৃত্রিম সংকট রোধে জেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব জেলা প্রশাসনগুলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সর্বশেষ বৈঠকেও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর উপস্থিতিতে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি বিভাগের মনিটরিং টিম এলপিজি আমদানি ও বোতলজাতকরণের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। ঢাকাসহ অন্য এলাকাতেও একই ধরনের তদারকি চলছে। আমরা মনে করি, এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি এবং ধীরে ধীরে দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
আন্তর্জাতিক শিপিং নিয়ে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, কিছু জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক শিপিংয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চলতি মাসে এসব সমস্যার কোনো প্রভাব এলপিজি সরবরাহে পড়েনি। তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব নেই, তবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আমরা নজরে রাখছি।
উপদেষ্টা জানান, এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালিত মোবাইল কোর্টে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব আউটলেট ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রি বন্ধ রেখেছিল, সেগুলো পুনরায় খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিইআরসির ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এ কমিশন গঠন করা হয়েছে। এটি একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে ক্রেতা, বিক্রেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অংশগ্রহণ থাকে। সরকার ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করতে চায় না।
সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা পুনরায় জানান, দেশে পর্যাপ্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী- আগের চেয়েও বেশি পরিমাণে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে।










