বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোলঘেঁষে হাওরকন্যা সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থান। ভৌগোলিক দিক থেকে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও এখানে ভিন্ন। বছরের বেশির ভাগ সময় হাওর থাকে জলমগ্ন। কৃষিকাজ বিশেষ করে ধান চাষই এখানকার মানুষের প্রধান পেশা। তবে হাওরাঞ্চলের দুঃখ বর্ষায় পাহাড়ি ঢল। নিমিষেই গ্রাস করে ফেলে কৃষকের সোনালি ফসল। মাটিতে ভরাট হয়ে কমছে বোরো চাষের ধানি জমি। ভারত থেকে নেমে আসা পাথর ও বালিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের বন্যায়।
সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অন্যতম হাওর ‘খরচার’। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা বালিমাটিতে ভরে গিয়েছে এ হাওরের অনেক কৃষিজমি। শুধু খরচার হাওর নয়, জেলার দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও ছাতকসহ সীমান্ত এলাকাগুলোর কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ, জলবায়ু ও কৃত্রিম বিপর্যয়ের মুখে হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে কমে গিয়েছে পানির ধারণক্ষমতা। ফলে ভারতের মেঘালয়ে একদিন বৃষ্টি হলেই ভাটিতে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি। যদিও জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, এবারের বন্যায় সীমান্ত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হাওরের জমিতে তেমন প্রভাব পড়েনি।
কৃষক হাশমত আলী বলেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়েছে খরচার হাওরের কৃষিজমি। বালি ভরাটে সেখানকার বোরো জমি এখন মাঠে রূপ নিয়েছে। এ হাওরে আমাদেরও কিছু জমি ছিল, বালি ভরাটে সব শেষ। এখন আর ওই জায়গায় ধান চাষ করা যাবে না। কৃষক সানোয়ার মিয়া বলেন, খরচার হাওরের পাশেই আমার বাড়ি। এবারের বন্যায় বাড়ির পেছনে বিশাল জায়গা বালিতে ভরে গিয়েছে। কৃষি জমিগুলো একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় দিন দিনই কমছে হাওরাঞ্চলের কৃষিজমি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, সুনামগঞ্জে সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, ৮০ হাজার হেক্টরে রোপা আমন ও ৩০ হাজার হেক্টরে আবাদ হয় আউশ ধান। কিন্তু এবারের বন্যায় জেলার পুরো আউশ ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বালি ও পলি ভরাটে নষ্ট হয়েছে জেলার সদর উপজেলার গৌরারং ও সুরমা ইউনিয়নের দুই থেকে আড়াইশ; দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর, দোহালিয়া, বোগলা বাজার, সুরমা, নরসিংপুর, পান্ডারগাঁও, বাংলাবাজার ও মান্নারগাঁওসহ আটটি ইউনিয়নের ১০৮ হেক্টর কৃষিজমি। এছাড়া তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার ছড়া দিয়ে ভারত থেকে নেমে আসা বালি ও পাথরেও অনেক কৃষিজমি ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় বালি ও পাথরে ভরাট হয়ে কৃষিজমি যেন খেলার মাঠে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, যে বছর বন্যায় বেশি পানি হয়, সে বছর বালি ও পলিমাটি বেশি আসে। এবারের বন্যা যেমন ভয়াবহ ছিল তেমনি ঘরবাড়ি, বোরো ও রোপা আমনের জমির ক্ষতি করেছে নদী দিয়ে আসা বালি ও পাথর। এসব জমিতে আর ধান চাষ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ধানের পরিবর্তে এসব জমিতে সবজি ও রবিশস্য বাদাম, সরিষাসহ তেলবীজ চাষাবাদ ভালো হবে।
পরিবেশ ও হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন হাওর এরিয়া আপলিস্টমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, এ বছরের বন্যায় বালি ও পলিতে ভরাট হয়ে গিয়েছে জেলার অনেক ফসলি জমি। সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের লালপুর অংশে সবচেয়ে বেশি জমি বালিতে ভরে গিয়েছে। তাহিরপুরের টেকেরঘাট সীমান্ত এলাকায়ও বালিমাটিতে কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে। এছাড়া দোয়ারাবাজার, ছাতক ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অনেক জায়গায় বন্যায় রাস্তাঘাট ভেঙে ফসলি জমির ক্ষতি করেছে। নিয়মিতই এভাবে ভরাট হতে থাকলে একটা সময় কৃষিজমির সংকট দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, হাওরের নিচু এলাকায় বাঁধ হওয়ায় পানি নামতে পারে না। তাই পাহাড়ি নদীগুলো ভরে যাচ্ছে। ফসলি জমিও নষ্ট হচ্ছে। শুধু ফসলি জমি না, অনেক সীমান্ত নদীও বালি ভরাটে মরে যাওয়ার পথে। তাই আমি মনে করি, পুরো হাওরাঞ্চলকে ঘিরে মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। সেই সঙ্গে যেখানে সেখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা যাবে না। হাওর ও নদী খননও করতে হবে পরিকল্পিতভাবে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দিন টিপু বলেন, উপজেলার গৌরারং ও সুরমা ইউনিয়নের ২০০-২৫০ হেক্টর জমি বালি ও পলিতে নষ্ট হয়েছে। তবে এসব জায়গায় বোরো ধান না হলেও রবিশস্য যেমন—সরিষা বা বাদাম চাষ ভালো হবে। দোয়ারাবাজার উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও বালি ভরাটে উপজেলার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে। জিরাগাঁও এলাকায় বাঁধ ভেঙে একেবারে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে আমন জমি। এছাড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর, বোগলাবাজার ইউনিয়নে ১০, সুরমা ইউনিয়নে আট, নরসিংপুর ইউনিয়নে ১০, পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়নে ১০, দোহালিয়াবাজার ইউনিয়নে ১৫, বাংলাবাজার ইউনিয়নে আড়াই ও মান্নারগাঁও ইউনিয়নে আড়াই হেক্টর জমি ভরাট হয়েছে বালিমাটিতে। এসব জমির বালি সরিয়েই কেবল পুনরায় ধান আবাদের উপযোগী করা সম্ভব। তবে ওইসব জমিতে এখন ধান চাষ করা না গেলেও বাদাম বা সরিষা চাষ করা যাবে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কবীর বলেন, উপজেলার সীমান্ত এলাকার ছড়া দিয়ে ভারত থেকে নেমে আসা বালি ও পাথরে অনেক কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে চানপুর নয়াছড়া এলাকায় বালি ও পাথরে ভরাট হয়ে কৃষিজমি খেলার মাঠ হয়ে গিয়েছে। আমরা সেখান থেকে এখন বালি-পাথর নিলামে বিক্রি করছি। প্রতি বছরই এভাবে বালি ভরাট অব্যাহত রয়েছে। তাই দিন দিন কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। তবে বালি-পাথরে ভরাট হওয়ার পুরো তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, দফায় দফায় বন্যায় জেলার সীমান্ত এলাকায় সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও হাওর এলাকায় তেমন ক্ষতি হয়নি। কিছু জায়গায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পলি এসে পড়ায় জমির উপকার হয়েছে। এখন ফসল চাষে সার কম লাগবে। জেলায় সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো, ৮০ হাজার হেক্টরে রোপা আমন ও ৩০ হাজার হেক্টরে আউশ ধান চাষাবাদ হয়। অল্প বৃষ্টিতেই এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় উল্লেখ করে এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পলি ও বালিতে হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রবাহিত পানি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেখার বিষয়।










