জলবায়ু ন্যায়বিচার, ন্যায্য ও সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কণ্ঠ শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ু সহনশীলতা তৈরির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়।

গতকাল বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে চতুর্থ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) লিডার্স মিটিং অন ডেভেলপমেন্ট রিসেট অ্যান্ড কোঅপারেশনে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকটির সভাপতিত্ব করেন সিভিএফের চেয়ার ও বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোটলি। এতে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, উন্নয়ন অংশীদার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের কেন্দ্রে ন্যায়বিচার, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সংহতি রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কণ্ঠ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আগামীকালের শিরোনাম নয়; এটি আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

ক্লাইমেট ভালনারেবল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরতে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি ঢাকা ডিক্লারেশন ২০১১ থেকে ঢাকা-গ্লাসগো ডিক্লারেশন ২০২১ পর্যন্ত বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব সম্মিলিত উদ্যোগ লস অ্যান্ড ড্যামেজ ইস্যুকে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বৈঠকে ভালনারেবিলিটি টু ভায়াবিলিটি (ভিটুভি) কমপ্যাক্ট এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান সাইমুম পারভেজ। জলবায়ুজনিত অভিঘাতে ব্যালান্স অব পেমেন্টসের ওপর চাপ তৈরি হলে দ্রুত লিকুইডিটি সহায়তা দিতে প্রস্তাবিত লাইফলাইন ফান্ডের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন জানান তিনি। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের মতো দেশে বড় একটি জলবায়ু দুর্যোগ কয়েক বছরের উন্নয়ন অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই জলবায়ু অভিঘাতের পর দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেয়ার সক্ষমতা থাকা জরুরি।

ফোর্থ সিভিএফ লিডার্স মিটিংয়েও ভিটুভি কমপ্যাক্ট এগিয়ে নেওয়া, লাইফলাইন ফান্ড কার্যকর করা এবং ক্লাইমেট ভালনারেবল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে আরো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশের ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০ শতাংশ কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরেন।

ক্লাইমেট ও ফাইন্যান্সের দ্বৈত সংকটের কথা উল্লেখ করে সাইমুম পারভেজ বলেন, ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে।

কপ৩১ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার তুলে ধরেন ড. সাইমুম পারভেজ। তিনি প্রেডিক্টেবল, কনসেশনাল ও ফেয়ার ক্লাইমেট ফাইন্যান্স নিশ্চিত করা; লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড পুরোপুরি কার্যকর করে দ্রুত ও সহজে অর্থ ছাড়; ডেট রিলিফ ও কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং বাড়াতে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার সংস্কার; এবং ক্লাইমেট অ্যাকাউন্টেবিলিটি জোরদারে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের অ্যাডভাইজরি ওপিনিয়ন কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ক্লাইমেট ভালনারেবল দেশগুলোকে যেন স্কুল নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক ডেভেলপমেন্টের প্রয়োজন এবং ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স তৈরির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে আরও ন্যায্য ও কার্যকর করতে হবে।

বক্তব্যের শেষে তিনি আরো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্লাইমেট অ্যাকশনকে সবার জন্য সাসটেইনেবল ও ইকুইটেবল ডেভেলপমেন্টের চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে।