রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পার হলেই শুরু উত্তরা ১ নম্বর সেক্টর। সেক্টরের জামে মসজিদ থেকে সার্ভিস সড়ক ধরে বিভিন্ন সড়ক হয়ে সহজেই জসীমউদ্দীন রোডসহ আশপাশ এলাকায় যাতায়াত করা যায়। গুরুত্বপূর্ণ এ আবাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এলাকায় প্রায় সাড়ে সাত মাস ধরে চলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উন্নয়নকাজ। এজন্য সার্ভিস সড়কসহ কয়েকটি সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে রাখায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল। কোথাও তৈরি হয়েছে বড় গর্ত, কোথাও উঁচু হয়ে আছে ড্রেনের স্ল্যাব ও ম্যানহোল। এরই মধ্যে বৃষ্টির পানি জমে থাকা কয়েকটি গর্তে মশার লার্ভাও দেখা গেছে। এতে সড়কে দুর্ভোগের পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
১ নম্বর সেক্টরের এসব সড়কের আশপাশে রয়েছে উত্তরা ক্লাব লিমিটেড, উত্তরা লেডিস ক্লাব, স্কলাস্টিকা সিনিয়র ক্যাম্পাস, ১ নম্বর সেক্টরের জামে মসজিদ, ব্যাংকার্স ক্লাব অব বাংলাদেশ লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যালয়। এছাড়া বিভিন্ন রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের অফিসসহ নানা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত রয়েছে। ফলে নির্মাণকাজের প্রভাব শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর নয়; শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আসা মানুষকেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সরজমিনে দেখা যায়, ১ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি সড়কে ড্রেনেজ লাইনের কাজের জন্য সড়কের অংশ খোঁড়া হয়েছে। কোথাও ড্রেনের কংক্রিটের স্ল্যাব ও ম্যানহোল নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর চারপাশে মাটি ও রাস্তার অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। কয়েকটি স্থানে মাটি সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে ফাটল ও খাদ। কোথাও খোঁড়া অংশ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পিচঢালা মূল সড়কের মাঝখানে তৈরি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ ও দীর্ঘ ড্রেন। সড়কের এসব গর্তে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। কয়েকটি গর্তের জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভাও দেখা গেছে। কোথাও পানি ঘোলা ও ময়লা হয়ে জমে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকায় এসব খোঁড়া অংশ মশার প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে।
খোঁড়া রাস্তার কারণে পিচের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একই সংকীর্ণ পথ দিয়ে রিকশা ও পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। নির্মাণকাজ চললেও কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সতর্কতামূলক চিহ্ন কিংবা রাতে দৃশ্যমান হওয়ার মতো আলোর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। শুধু কিছু কিছু জায়গায় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় বাঁশের খুঁটি ও ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে।
ফুটপাতের বিভিন্ন অংশেও নির্মাণকাজের প্রভাব স্পষ্ট। রাস্তার মাঝখানে ও ফুটপাতে যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছে ইট, বালি, সুরকি ও বালির বস্তার বিশালাকার স্তূপ। এতে ড্রেনের ঢালাইয়ের নতুন ম্যানহোলগুলো উঁচু হয়ে আটকে থাকার কারণে গাড়ি ও স্বাভাবিকপথচলা ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তরা ক্লাব লিমিটেডের প্রবেশপথের সামনেও ফুটপাতে মাটির বড় স্তূপ দেখা যায়। পাশেই রয়েছে খোঁড়া অংশ। এতে ক্লাবসহ আশপাশের ভবন ও প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ-বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে রয়েছে বালি, মাটি ও ইটের টুকরো।

সড়কের একাংশ খোঁড়া থাকায় অনেক জায়গায় যানবাহনকে সংকুচিত অংশ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কোথাও আবার খোঁড়া অংশ এড়িয়ে এক লেন থেকে অন্য লেনে সরে যেতে হচ্ছে। এতে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে জানান চালকেরা।
রিকশাচালক রফিক বলেন, ‘রাস্তার কিনারে বড় বড় খাদ, আবার অনেক জায়গায় উঁচু-নিচু। রাতে ভালোভাবে দেখা যায় না। চাকা গর্তে পড়লে যাত্রীসহ রিকশা উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে। প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল এখনো রাস্তা ঠিক হলো না।’
এ রাস্তায় নিয়মিত চলাচলকারী বেসরকারি চাকরিজীবী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখায় অনেক ঘুরে জসীমউদ্দীন রোড দিয়ে অফিসে যেতে হচ্ছে, এতে অফিসে যেতে প্রায়ই দেরি হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তার বিভিন্ন গর্তে গাড়ির চাকা প্রায়ই ডেবে যাচ্ছে, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। উল্টো পাশ থেকে কোনো যানবাহন এলে থেমে থাকতে হয়।’
এলাকার বাসিন্দা রাশেদা বেগম নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করেন এ রাস্তায়। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে রাস্তা ভালো থাকলেও বর্তমানে ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ চলতে থাকায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। মাসের পর মাস রাস্তা খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘কাজ কবে শেষ হবে, সেটা আমরা জানি না। খোঁড়া রাস্তার গর্তে মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে। কাজ শুরু হওয়ার পরে মশা বাড়ছে।’
একটি অফিসের ব্যক্তিগত গাড়িচালক নাজিম বলেন, ‘উঁচু-নিচু স্ল্যাব আর খাদের কারণে গাড়ির নিচে আঘাত লাগে। দিনের চেয়ে রাতে সমস্যা বেশি হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজের কারণে ফুটপাতের বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের সড়কে নেমে চলতে হচ্ছে।
এক বাসিন্দা বলেন, ‘উন্নয়নকাজ দরকার। কিন্তু কাজ চলার সময় মানুষের চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এখন রাস্তা দিয়ে হাঁটতেও ভয় লাগে। তার ওপর গর্তে পানি জমে মশা হচ্ছে।’
সড়কের পাশে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের লাগানো সাইনবোর্ডে প্রকল্পটির বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিএনসিসির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সেক্টর-১-এর স্কলাস্টিকা স্কুলের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ১ নম্বর সেক্টরে মাস্টার ড্রেনেজ লাইন নির্মাণের লক্ষ্যে সেক্টর-১-এর সড়ক নম্বর ৮, ৯ ও পশ্চিম পাশের সার্ভিস সড়কে ফুটপাত ও পাইপ নর্দমা নির্মাণসহ রাস্তা উন্নয়নের কাজ চলছে।
প্রকল্পের কাজের ধরন বিটুমিনাস রোড। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাইনবোর্ডে নোনা ট্রেডার্সের নাম উল্লেখ রয়েছে। কাজ শুরু হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ৩১ জানুয়ারি ২০২৭। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ, অঞ্চল-১, উত্তরা। অর্থাৎ কাজ শুরুর পর প্রায় সাড়ে সাত মাস পার হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার এখনো কয়েক মাস বাকি রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে কাজ চলাকালে জননিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দাবি, নির্মাণকাজ চলার সময় খোঁড়া অংশে শক্ত ব্যারিকেড, সতর্কতামূলক সাইন ও রাতে দৃশ্যমান রিফ্লেক্টরের ব্যবস্থা করতে হবে। ফুটপাত ও ভবনের প্রবেশপথ থেকে নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করারও দাবি জানান তারা।
এছাড়া খোঁড়া সড়কের গর্তে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং মশার লার্ভা জন্মানোর মতো স্থানগুলো পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খোলা মাটি ও বালি থেকে ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং বৃষ্টির পানি যাতে দীর্ঘ সময় জমে না থাকে, সে ব্যবস্থাও চান তারা। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে সড়ক ও ফুটপাত স্বাভাবিক ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসির) অঞ্চল-১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না; আপনার মাধ্যমেই জানলাম, এভাবে পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। তবে উন্নয়নমূলক কাজ চলমান থাকলে সাময়িকভাবে খানিকটা নাগরিক ভোগান্তি হওয়া স্বাভাবিক।’
তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘মশার বংশবিস্তার যাতে না হয় এজন্য সড়কের গর্তগুলোয় জমে থাকা পানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যারিকেড বসানো হবে, যাতে পথচারী ও যানবাহনচালকরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন।’










