বিগত ২৬ বছরে (২০০০-২০২৫) কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান ১০টি গন্তব্য দেশে বাংলাদেশীদের মোট ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯২টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ফ্রান্সে, ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৪৫টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইতালিতে জমা পড়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৪১৫টি। এ দুই দেশেই পড়েছে শীর্ষ ১০ দেশের মোট আবেদনের প্রায় ৫৩ শতাংশ। সামগ্রিক হিসাবে ফ্রান্স শীর্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়ছে ইতালিতে। তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, গ্রিস, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রও। রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে এসব আবেদন করা হয়েছে। তবে আশ্রয় চাওয়ার বিপরীতে অনুমোদনের হার কম।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ বছরে ফ্রান্সে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৪৫টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইতালিতে এ সংখ্যা ১ লাখ ৫২ হাজার ৪১৫। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় ৭৭ হাজার ৮০৪, যুক্তরাজ্যে ৪৮ হাজার ৭৮৫, গ্রিসে ৪৫ হাজার ৩৩৮, কানাডায় ৩৩ হাজার ৫০২, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ হাজার ৭৯৮, সাইপ্রাসে ২১ হাজার ২৮৬, অস্ট্রিয়ায় ১০ হাজার ৭৭৯ ও জার্মানিতে ১০ হাজার ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফ্রান্স ও ইতালিতেই জমা পড়েছে ৩ লাখ ৯ হাজারের বেশি আবেদন, যা এ ১০ দেশে মোট আবেদনের প্রায় ৫৩ শতাংশ। এককভাবে ফ্রান্সের অংশ প্রায় ২৭ শতাংশ। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিয়ে আবেদন পড়েছে প্রায় ৬৪ হাজার বা ১১ শতাংশ। তালিকার ১০টি দেশের মধ্যে সাতটিই ইউরোপের। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের সামগ্রিক হিসাবে ফ্রান্স শীর্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইতালি। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়া তিন দেশ হলো যথাক্রমে ইতালি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।

ফ্রান্স বাংলাদেশকে নিরাপদ উৎস দেশের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার পর মূলত দেশটিতে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদন বেড়ে যায়। আবেদনকারীরা রাজনৈতিক নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা, জমি নিয়ে বিরোধ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে

ফ্রান্সের শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুরক্ষা দপ্তর (ওএফপিআরএ) এবং ন্যাশনাল কোর্ট অব অ্যাসাইলামের (সিএনডিএ) একটি যৌথ প্রতিনিধি দল ২০১৫ সালের ২ থেকে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ সফর করে। ওই বছরের জুনে সংস্থা দুটি ‘রিপোর্ট অন দ্য মিশন টু দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন তৈরি করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ফ্রান্সের নিরাপদ উৎস দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ে। এরপর দেশটিতে বাংলাদেশীদের বার্ষিক আশ্রয় আবেদন তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১৪ সালে জমা পড়ে ৩ হাজার ৫৮২টি আবেদন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২৫টি প্রাথমিক ও ১ হাজার ১৫৭টি আগের আবেদনের পুনর্বিবেচনার আবেদন। আশ্রয়প্রার্থীদের অভিযোগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিনিধি দল রাজনৈতিক বিরোধের জেরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিপীড়ন, জাল মামলা, জমি দখল এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার অভিযোগও পর্যালোচনা করেছে।

বর্তমানে ফ্রান্সে আশ্রয় পাওয়া বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি ভিজিট ভিসায় ফ্রান্সে ঘুরতে এসেছিলাম। তখন দেশে আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের এলাকায় থাকতে দিত না। ব্যবসাও করতে পারছিলাম না। চারটি মিথ্যা মামলা দিয়ে রেখেছিল। পত্রিকায় নিউজও হয়েছে। যেহেতু কয়েকটি দেশে যাতায়াতের সুযোগ হয়েছে, তাই ফ্রান্সে ভিজিট ভিসা পাই। এখানে আসার পর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করি।’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদন এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর মধ্যে ইতালিতে জমা পড়ে ৩৩ হাজার ৪৫৫টি বা মোট আবেদনের ৭৭ শতাংশ। একই বছর ফ্রান্সে ৬ হাজার ৪২৯টি ও আয়ারল্যান্ডে ১ হাজার ৬টি আবেদন জমা পড়ে।

এর আগের বছর ২০২৩ সালে ফ্রান্সে বাংলাদেশীদের আবেদন ছিল ১০ হাজার ২১৫টি, যা ইইউ প্লাস অঞ্চলে তাদের মোট আবেদনের ২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেও ইতালির প্রাধান্য অব্যাহত ছিল। এ সময়ে বাংলাদেশীদের মোট আবেদনের ৭৪ শতাংশই জমা পড়ে দেশটিতে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোয় অভিবাসন নীতি শিথিল থাকায় বাংলাদেশীরা পারিবারিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। তবে বর্তমানে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে কঠোর অভিবাসন নীতি এবং আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ায় ইউরোপমুখী হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে অনিয়মিত অভিবাসন রোধ এবং দেশের ভেতরে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই।’

ইউরোপে বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের অধিকাংশই নাকচ হচ্ছে। ইইউএএর ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস: মিড-ইয়ার রিভিউ ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশীদের আবেদনে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম ধাপে নিষ্পত্তি হওয়া প্রতি ১০০টি আবেদনের মধ্যে তিনটি অনুমোদন পেয়েছে। একই সময়ে সব দেশের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল গড়ে ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশের মতো ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের আবেদন অনুমোদনের হারও ছিল ৩ শতাংশ। মিসরের ক্ষেত্রে তা ২ শতাংশ। বিপরীতে মালির নাগরিকদের আবেদন অনুমোদনের হার ছিল ৮৭ শতাংশ, হাইতির ৮৪, আফগানিস্তানের ৭৩ ও সুদানের ৬৫ শতাংশ।

ইইউএএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশীদের ৯৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৯৬ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। দেশভিত্তিক হিসাবে ইতালিতে আবেদন অনুমোদনের হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ১২ দশমিক ৪ ও ফ্রান্সে ৭ শতাংশ। কানাডায় এক হিসাবে এ হার ২২ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশীদের বিপুলসংখ্যক আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে এমন আবেদনের সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৭৭৮। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত অনিষ্পন্ন ছিল ৪৫ হাজার ১২৯টি আবেদন। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশগুলোয় প্রথমবারের মতো আশ্রয় চেয়েছেন ৫৭ হাজার ৫৫০ বাংলাদেশী। ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিস সম্প্রতি আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়িয়েছে। ফলে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা বাড়ছে।

ইইউএএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউ প্লাস দেশগুলোয় আশ্রয় আবেদন আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কমে প্রায় ৮ লাখ ২২ হাজারে নেমেছে। তবে ফ্রান্সে আবেদন সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ লাখ ৫২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে আবেদন কমলেও ওই বছরের মার্চে বাংলাদেশীদের প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে, যা সিরীয়দের আবেদনের চেয়ে বেশি।

ইউরোপের নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে বাংলাদেশীদের অভিবাসন বেশি হওয়ার পেছনে শিথিল অভিবাসন নীতি, পূর্বপরিচিতদের সাফল্য এবং পারিবারিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ভূমিকা দেখছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। তার মতে, উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসে আগ্রহীদের অনেকে সেখানকার প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। তারা কর্মী, শিক্ষার্থী বা পর্যটক ভিসায় এসব দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

আসিফ মুনীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অভিবাসনের ঢেউ শুরুর সময় এসব দেশের নীতি তুলনামূলক শিথিল ছিল। অনেকে স্বল্পমেয়াদি ভিসায় গিয়ে পরে আশ্রয় চেয়ে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পান। একজনের সাফল্য অন্যদের উৎসাহিত করে। এভাবে একই অঞ্চলের মানুষ একই গন্তব্যে যেতে থাকেন। ব্রিটিশ আমল থেকে গড়ে ওঠা ধারায় যুক্তরাজ্যে যাওয়া বাংলাদেশীদের বড় অংশ সিলেটের। ইতালি ও গ্রিসের মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও পারিবারিক বন্ধনের ধারণাও বাংলাদেশীদের উৎসাহিত করেছে। গত প্রায় ২৫ বছরে সরকার পরিবর্তনের সময়গুলোয় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে এখন এ প্রবণতা কমছে। ইতালি আশ্রয় আবেদনের বর্তমান হার নিয়ে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাজ্যও অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়ের আবেদন বাড়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের কারণে রাজনৈতিক মামলা, হামলা ও গুমের ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে সে ধরনের পরিস্থিতি বা অস্থিরতা নেই। তার পরও অনেকে অবৈধভাবে ইউরোপসহ উন্নত দেশে ঢুকে বা বৈধ কাগজপত্রের অভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় চান, যার মূল উদ্দেশ্য স্থায়ীভাবে বসবাস। আশ্রয় প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই; সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও কর্তৃপক্ষ।’