বগুড়া জেলায় মাছ আহরণের প্রধান খাত ছিল করতোয়া, নাগর, ইছামতি, বাঙ্গালী ও যমুনা নদীর পাশাপাশি বিল ও পুকুর। সময়ের চাহিদায় পুকুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ উৎপাদন শুরু হয় যা থেকে এসেছে সফলতা। গত দুই বছরে জেলায় মাছ উৎপাদন বেড়েছে ৬ হাজার ৬৬০ টন। বছরে মাছের চাহিদা রয়েছে ৭৮ হাজার টন। সেখানে প্রায় ৬০ হাজার পুকুরে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫০৬ টন। চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত রয়েছে ২৬ হাজার ৫০৬ টন। এসব মাছ সরবরাহ করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

বগুড়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে পুকুর রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে মাছের বাণিজ্যিক খামার রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। ৬৭টি বিল, আটটি নদী ও ৩০টি খাল থাকলেও মূলত পুকুরেই সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হয়। এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষের।

এ ব্যাপারে বগুড়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কালীপদ রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ১ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়। উদ্বৃত্ত মাছ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়। ২০২২ সালে জেলায় মাছের উৎপাদন ছিল এক লাখ টনের বেশি। ২০২১ সালে উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৮ হাজার টন। সেখান থেকে গত কয়েক বছরে মাছের উৎপাদন বেড়ে এক লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। চাষীদের মাছ চাষে আগ্রহী ও ভালোমানের মাছ উৎপাদনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এজন্য খাল-বিল সংস্কার ও নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ উৎপাদন হয় আদমদীঘি উপজেলায়। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সেখানে পুকুর বা জলাশয়ের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার। হ্যাচারি রয়েছে ৬০টি। এসব হ্যাচারি থেকে রেণু উৎপাদন হয় প্রায় ১০ হাজার কেজি। পাঁচ-ছয়দিন বয়সী রেণু থেকে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ছয় হাজার টন। পরে পোনা বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাছচাষীদের কাছে। রুই, কাতল, দেশী শিং, মাগুর, পাবদা, তেলাপিয়া, পাঙাশ, কার্প, কমন কার্প, মৃগেল, সিলভার কার্প, সরপুঁটি, টেংরা, কার্ফু ও পুঁটি মাছের পোনা উৎপাদন হয় এখানে।

আদমদীঘি উপজেলার ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির চাষীরা জানান, আদমদীঘি, কাহালু, দুপচাঁচিয়া, নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জসহ এ জেলায় প্রচুর মাছ উৎপাদন হয়। সম্প্রতি মাছের খাবারের দাম বেড়েছে। আগে ২৫ কেজি খাবার ছিল ৬৫০-৭০০ টাকা। এখন সেটি হয়েছে ৯৫০ টাকা। সে তুলনায় মাছের দামের তেমন একটা বাড়েনি। এক কেজি সাইজের রুই মাছ বগুড়ার বাজারে আগে খুচরা বিক্রি হয়েছে ২৪০-৩০০ টাকা। এখন বিক্রি হয় ২৮০-৩২০ টাকা করে। খুচরা বাজারে দাম খুব একটা বাড়েনি। কিন্তু মাছ চাষের খরচ বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আয় কমেছে চাষীদের। মাছের খাবারের বাজার দর নিয়ন্ত্রণ না করলে মাছ চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে চাষীদের।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সদর উপজেলায় মাছ উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৭ হাজার ৯০০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২০০ টন। শেরপুরে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ১০০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৮০০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯৬৭ টন। আদমদীঘি উপজেলায় ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ১৯ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ৫১৯ টন। কাহালুতে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৮০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ২৭৬ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয় ১৩ হাজার ৮০৫ টন। সোনাতলায় ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৫৯৪ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৪ হাজার ৬৯৯ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭০৫ টনে। সারিয়াকান্দিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৪ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৫৯৭ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৬৫৪ টন।

এছাড়া শাজাহানপুরে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৮৬০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৬ হাজার ৮৩ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ২৭৮ টন। শিবগঞ্জে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় প্রায় ১২ হাজার ৬১০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৭৯৩ টন। দুপচাঁচিয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার ৭৮৪ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় প্রায় ৬ হাজার ৮৫২ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৯২০ টন। গাবতলীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ১০০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৭ হাজার ৩০০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৬৪০ টন। ধুনটে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৭৩২ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৯২৯ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ১৩৬ টন। নন্দীগ্রামে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৬০০ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় প্রায় ৫ হাজার ৭৯০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৮৯ টন।