জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী সম্পদের মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মোড অব পেমেন্ট (অর্থ লেনদেনের ধরন) খুঁজবে সংস্থাটি। গত ১২ মার্চ নির্দেশনাটি প্রকাশ হলেও সম্প্রতি এটি জানাজানি হয়েছে।

নতুন নির্দেশিকা অনুসারে, আয়কর নথিতে প্রদর্শন করা থাকলেও বাস্তবে ভবনের তলার সংখ্যা, স্পেস, ফিটিংস ও জমির অবস্থান অনুযায়ী মূল্য বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরিমাপ করে নির্ধারণ করতে হবে। জমির মূল্য অস্বাভাবিক কম হলে ওই এলাকায় গত পাঁচ বছরের জমির দলিলে উল্লেখ করা গড় মূল্য বিবেচনায় নিতে হবে। জমি বা ফ্ল্যাট বা স্থাপনার ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা প্রদর্শিত মূল্যের অতিরিক্ত কোনো লেনদেন করেছেন কিনা, তা যাচাই করে দেখতে হবে।

ব্যাংক হিসাব যাচাইকালে সন্দেহজনক লেনদেনগুলো পৃথকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনসহ সব তফসিলি ব্যাংকের হিসাব যাচাই করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউয়ের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। বিকাশ, রকেট ও নগদ ইত্যাদি মোবাইল ফাইন্যান্সিংসহ কুরিয়ারে লেনদেনের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য মিলিয়ে দেখতে হবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৯ জুলাই জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য প্রথম নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। তার আগে এ বিষয়ে শুধু একটি অফিস আদেশ ছিল।

নির্দেশিকা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে আমেরিকায় ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), ইংল্যান্ডে সিরিয়াস ফ্রড অফিস (এসএফও), অস্ট্রেলিয়ায় ইনডিপেনডেন্ট কমিশন অ্যাগেইনস্ট করাপশন (আইসিএসি) এবং ভারতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টর (ইডি) এ ধরনের কাজ করে থাকে। বিশ্বের এসব দেশ ও আমাদের রুল-রেগুলেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। দুদক চায়, একই ব্যক্তি যেন একই বিষয়ে বারবার হয়রানির শিকার না হয়। অনুসন্ধান ও তদন্তকারীদের যেন একই কাজ বারবার করতে না হয়। এতে উভয়পক্ষে ঝামেলা ও হয়রানি কমবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল মূল্য ধরে এতদিন অনুসন্ধান করা হতো। কিন্তু এতে প্রকৃত ক্রয় বা বিক্রয়মূল্য জানা যেত না। দলিল মূল্যের বাইরে কোনো লেনদেন হয়েছে কিনা, সেটা এখন যাচাই করা হবে। এটাই হলো মোড অব পেমেন্ট। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দলিল মূল্য ৫ লাখ। কিন্তু গড় মূল্য ১৫ লাখ। অথবা দলিল মূল্য ৫ লাখ। পেমেন্ট পে অর্ডারে ১৫ লাখ। এভাবে যাচাই করাকে পেমেন্ট মোড যাচাই বলা হয়। কারণ একই এলাকায় মৌজা মূল্য একই হলেও জায়গার গুরুত্বভেদে জমি বা ফ্ল্যাটের মূল্যে বিশাল পার্থক্য থাকে। কিন্তু ক্রেতা মৌজা মূল্য দলিলে দেখিয়ে প্রকৃত মূল্য গোপন করেন।

মোড অব পেমেন্টের উদাহরণ দিয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ধরুন ‌সম্পদ কেনা হয়েছে আপনার দারোয়ানের নামে। অথচ মূল্য পরিশোধ করেছেন আপনি। এক্ষেত্রে দুদক মোড অব পেমেন্ট হিসেবে লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে প্রমাণ করবে সেটি আপনারই বেনামি সম্পদ।’

আয়ের উৎস যাচাই নিয়ে বলা হয়েছে, সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত কৃষি, মৎস্য চাষ, রাখি মালের ব্যবসা, স্বর্ণ অথবা অন্যান্য সম্পদ ক্রয়/বিক্রয়, ঋণ/দান বা গ্রহণ অথবা অন্যান্য সব উৎস হতে আয় ইত্যাদির ছবি বা ডিজিটাল ডকুমেন্ট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যয়ন, ভাউচার সংযুক্ত করতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার আগে সরকারি চাকরিজীবীর স্ত্রী অথবা স্বামী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি নিয়েছে কিনা, এ-সংক্রান্ত প্রত্যয়ন যাচাই করতে হবে।