আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের স্ট্রাইক বা হরতাল ডাকাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে এ ধরনের কোন কর্মঘট বা হরতাল ডাকলে বাস মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আজ রোববার বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে আদালত বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব নির্বাহী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আদেশ পালন করতে বাধ্য। কোনো রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আপিল বা আইনানুগ প্রতিকার চাইতে পারে। তবে ওই রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট বা কর্মবিরতি আহ্বানের সুযোগ নেই।
আদালত পর্যবেক্ষণে আরো বলেন, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মসূচি বিচার বিভাগের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)-সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদালতের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
২০১১ সালের আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে একটি গাড়ির আরোহী তারেক মাসুদ মিষুক মনিরসহ পাঁচজন নিহত হয়। ওই ঘটনায় বাসচালকের বিরুদ্ধে মামলা হলে ২০১৭ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ড্রাইভারকে সাজা দেয়। ওই সাজার প্রেক্ষিতে বাস মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল ডাকার সংবাদ মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) একটি রিট পিটিশন দায়ের করে।
ওই রিট পিটিশন শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চান। আদালত এক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট/ হরতাল প্রত্যাহার এবং গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সে মোতাবেক পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
এইচআরপিবি এর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসদ, তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল, অ্যাডভোকেট রিপন বাড়ৈ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডিএজি মোহাম্মদ আহসান হাবীব, বিআরটিসি পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আসিবুল হক, বিআরটিএ'র পক্ষে ছিলেন এডভোকেট মো. রাফিউল ইসলাম।
এইচআরপিবি-এর পক্ষে রিট আবেদনকারী হলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল ইসলাম। অপরদিকে বিবাদীরা হলেন সচিব সেতু বিভাগ, সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চেয়ারম্যান বিআরটিএ এবং বিআরটিসি, ডিআইজি ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জ, এবং সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি মোট ১৭ জন।
এইচআরপিবি পক্ষের কৌশুলী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের আর্টিকেল ১১২ অনুসারে যে কোনো রায় ও নির্দেশনা মানতে সব কর্তৃপক্ষ বাধ্য। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণে ড্রাইভারকে সাজা দেয়ার প্রেক্ষিতে মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে আদালতের আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সব নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতা যেটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে বলে মিডিয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।










