যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় আইয়ুব খানের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় হাঁস-মুরগির খামার। ওই সময় এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় খামার ছিল এটি। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে অবাঙালি দোসররা বিভিন্ন স্থান থেকে অগণিত বাঙালিকে ধরে এনে হত্যা করে ফেলে রাখত খামারের কূপে। এভাবেই জায়গাটি পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। সরকারি হাঁস-মুরগি খামারসংলগ্ন স্থানে পরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সৌধ। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন যশোরের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত অবাঙালিরাই এখানে হত্যাযজ্ঞ চালায়। হাবিব, টেনিয়া, কালুয়া, রমজান, মোস্তাফা ছাড়াও সে সময় শহরের অবাঙালি শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালিদের ধরে এনে গলা কেটে হত্যা করত।

স্থানীয়রা জানান, শত শত মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়েছে। খামারের ভেতরে মুরগি রাখার ৪ ও ৫ নং শেডে মরদেহ পুঁতে রাখা হতো। এ শেডের পাশে ছিল পাম্পহাউজ। পাশে ছিল বিরাট কুয়া। কুয়াটি খনন করা হয় মরা মুরগি ফেলার জন্য। সেই সময় ওই কুয়ায় বাঙালিদের মরদেহ ফেলা হতো।

সরকারি হাঁস-মুরগি খামারের পাশে কালিতলার গায়ে ১৯৯১ সালে একাত্তরের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। ২০০৪ সালে সরকারি উদ্যোগে দর্শনীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৬ সালের ২৪ মার্চ তত্কালীন মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম এটি উদ্বোধন করেন। সেই সময় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে এ বধ্যভূমিতে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

সংগঠনের তত্কালীন সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, খামারের মধ্যে বড় বড় দুটো কুয়া ছিল। যেখানে রোগাক্রান্ত মৃত মুরগি ফেলা হতো। পাকিস্তানি আর্মি ও এ দেশে থাকা তাদের দোসররা ওই কুয়া দুটোয় বাঙালিদের হত্যা করে ফেলত। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী এখান থেকে কয়েক ট্রাক হাড়-কঙ্কাল সরিয়ে নিয়ে যায়। এগুলো আমরা দেখেছি।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলার সাবেক কমান্ডার রাজেক আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অবাঙালিদের মধ্যে মাস্তান শ্রেণীর যারা ছিল, তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালিদের ধরে এনে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগিতায় হত্যা করে এখানে ফেলত। তারা শত শত বাঙালিকে হত্যা করে। পরে যশোরের সংস্কৃতিমনা লোকজন সেখানে প্রথম একটি স্তম্ভ তৈরি করেন।

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বধ্যভূমির এ সৌধ সংস্কার ও আধুনিকীকরণে মন্ত্রণালয় থেকে বড় অংকের টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু সরকারি খামার কর্তৃপক্ষ জায়গা দিতে না চাওয়ায় প্রকল্পটি থেমে রয়েছে।

এ বিষয়ে যশোর সরকারি হাঁস-মুরগি খামারের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সফিকুর রহমান বলেন, এ-সংক্রান্ত একটি সরকারি চিঠি পেয়েছি। ডিজি মহোদয়ের সঙ্গে কথা না বলে এ বিষয়ে কিছু বলতে চাইছি না।