বর্ষা এলে চিন্তা বাড়ে উত্তরের জনপদ রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের মানুষের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর দুইপাড়সহ চরাঞ্চলের বসিন্দারা। শুষ্ক মৌসুমে বাধ সংস্কার না হওয়ায় এবারো বর্ষা ঘনিয়ে আসায় ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে তাদের। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় এসব নদ-নদীর অরক্ষিত পাড়ের বাসিন্দারা।
সম্প্রতি সরজমিনে দেখা গেছে, এসব জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি ও ফসল হারাতে হয় এসব নদ-নদীর দুইপাড়ের বাসিন্দাদের। তবে চারটি প্রধান নদ-নদীর মধ্যে শুধু ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারে ভাঙনরোধে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প চলমান। তবে প্রকল্প নেয়া হয়নি তিস্তায়। এ কারণে এ বছর ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে তিস্তাপারের বাসিন্দারা।
প্রতি বছর বন্যায় প্রথম আক্রান্ত হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি, কোলকোন্দ, নোহালী, গঙ্গাচড়া সদর এবং গজঘণ্টা ইউনিয়ন। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গার্নারপাড়, বিনবিনার চর, শঙ্করদহ, পশ্চিম ইচলি, পূর্ব ইচলি, বাঘেরহাট, চর ঈশ্বরপুর, জয়রাম মৌজা, মর্নেয়া, রমাকান্ত এবং সারাই।
গার্নারপাড় গ্রামের মকসুদার রহমান গত বছরের বন্যার দুর্বিষহ দিনগুলোকে দুঃস্বপ্ন বলে মনে করেন। রোজায় সেহরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিস্তার পানি তাদের গ্রামে প্রবেশ করে। নিমিষে বাড়ির উঠানে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় পানি জমে যায়। দেরি না করে বাড়ির ঘুমন্ত শিশুসহ অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ছুটে চলেন নিরাপদ গন্তব্যের দিকে। সেদিন গ্রামের কেউ কোনো জিনিস ঘর থেকে বের করতে পারেনি। শুধু জীবন নিয়ে সবাই নিরাপদ স্থানে যেতে পেরেছেন।
এছাড়া প্রতি বছর তিস্তা নদীর পানিতে কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই, পাঞ্জরভাঙ্গা, নিচপাড়া, তালুকশাহবাজ, ঢুসমারা এবং হরিশ্বর গোপিভাংগা; টেপামধুপুর ইউনিয়নের চরগনাই, হযরত খাঁ; হারাগাছ ইউনিয়নে চর নজিরদহ শহীদবাগ এবং চর নজিরদহ এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আনছার আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষা পুরোপুরি শুরুর আগে যদি বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মেরামত করত, তাহলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যেত।’
বর্ষায় তিস্তার পানি বাড়লে পীরগাছা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের বেশকিছু গ্রামের বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন। গ্রামগুলো হচ্ছে ছাওলা ইউনিয়নের গাবুড়া, দৌলত খাঁ, কান্দিরা, শিবদেবচর, চর ছাওলা, কামারের হাট, রামসিং, জুয়ানের চর, তাম্বুলপুর ইউনিয়নের চর তাম্বুলপুর, নামাচর ও চর রহমত অন্যতম।
ছাওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নাজির হাসেন বলেন, ‘এ ইউনিয়নের গাবুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বাঁধ নির্মাণ করে দেয়ায় বিদ্যালয়টি রক্ষা পায়। অবশ্য ওই সময় পাউবো থেকে জিও ব্যাগ দিয়েছিল। কিন্তু নতুন করে জিও ব্যাগ না ফেললে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে পাউবো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।’
তিনি অভিযোগ করেন, তিস্তা নদীতে পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতি বছর তার ইউনিয়নে কমবেশি ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে ৭০০ একর জমি এবং ১৫০টি বাড়ি বিলীন হয়েছে। এছাড়া কমবেশি ১০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে।
রংপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলামও স্বীকার করেন তিস্তা ডানতীর রক্ষা বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার গার্নারপাড় এবং মর্নেয়ায় বাঁধের কিছু পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া কাউনিয়া উপজেলার গদাই ইউনিয়ন এবং পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নে তিস্তা নদীসংলগ্ন তীরে ভাঙন রয়েছে।
বর্ষার আগে এসব স্থানে পাউবো সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজের অনুমোদন এবং প্রাক্কলন করে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো অনুমতি না পাওয়ায় সংস্কারকাজ শুরু করা যাচ্ছে না।’
কুড়িগ্রাম পাউবোর তথ্যমতে, ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষায় স্থায়ীভাবে একটি বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে অনেক আগে। বর্তমানে চলমান রয়েছে বাম তীর রক্ষাকাজও। ব্রহ্মপুত্রের শুধু ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোয় তীর রক্ষার কাজ করা হলেও পর্যায়ক্রমে নদের দুই তীর রক্ষা করার পরিকল্পনা করেছে পাউবো।
অন্যদিকে গত বছর থেকে চলমান ধরলা নদীর তীর রক্ষার কাজও। এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ। ফলে ধরলা নদীর ভাঙন প্রবণতা অনেকটা কমে গেছে বলে জানায় পাউবো। একইভাবে দুধকুমারেও চলমান তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ। কয়েকটি গ্রুপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি করা হচ্ছে। দুধকুমারেও শেষ হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ। তবে এসব নদ-নদীর দুই পাড় ভাঙনরোধে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও ব্রহ্মপুত্রের মাঝে ছোট ছোট চর ও দ্বীপগুলো রক্ষায় কোনো প্রকল্প নেয়া হয়নি। তিস্তা নিয়ে মহাপরিকল্পনার কারণে শুধু তিস্তার তীর রক্ষায় কোনো প্রকল্প নেয়নি সরকার। এ কারণে গত বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারের ভাঙন কমে গেলেও ভেঙেছে তিস্তা। যদিও সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেছিল পাউবো।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারের স্থায়ী তীর রক্ষায় প্রকল্প চলমান থাকলেও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশায় তিস্তায় কোনো স্থায়ী প্রকল্প নেয়া হয়নি। এ কারণে বিগত বছরের মতো এবারো ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার কথা। তবে আগামীতে অন্যান্য নদ-নদীর মতো তিস্তায়ও স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্প পাস হলে কাজ শুরু করা হবে।’
অন্যান্য নদ-নদীর অরক্ষিত এলাকার ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে চরাঞ্চল রয়েছে, সেখানে ভাঙন রোধে কাজ করার পরিকল্পনা হচ্ছে। তাছাড়া এবার বর্ষায় অন্যান্য নদ-নদীর যেসব অরক্ষিত এলাকা রয়েছে, সেখানে ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা হবে।’
তিস্তা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা উপজেলার গোড্ডিমারী, সিন্দুর্ণা, ডাউয়াবাড়ী, পাটিকাপাড়া, সিঙ্গিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভাণ্ডার, ভোটমারী, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ও সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, পঞ্চগ্রাম ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ড। কিছু কিছু এলাকায় বালির বাঁধ ও ব্লক দেয়া হলেও পুরোপুরি নদী শাসন না থাকায় প্রতি বছর বন্যায় নদীগর্ভে চলে যায় ফসলি জমি ও বসতভিটা। ভাঙন রোধে পাউবোর আগাম কোনো প্রস্তুতি না থাকায় নদীপারের বাসিন্দারা শঙ্কায় রয়েছেন।










