ছোট-বড় বেশ কয়েকটি টিলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সিলেট শহরতলির গ্রাম ‘টিলারগাঁও’। একসময় সেটি খাদিমনগর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন সিটি করপোরেশনের বর্ধিত ৩৭ নং ওয়ার্ডে ঠাঁই হয়েছে। গ্রামের অনেক টিলা কেটে দখল করা হয়েছে ভূমি। যেগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত তৈরি হয়েছে একের পর এক ঘর। এছাড়া শহর ও জেলার আরো অনেক টিলায় রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। এসব ঘর ও ভবন ঘিরেই এখন রাজ্যের শঙ্কা। প্রবল বৃষ্টিতে টিলা ধসে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

সিলেটে তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। গত বছর ভারি বর্ষণে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এবারো সে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। যদিও কেবল নির্দেশনা দিয়েই দায় সেরেছে সিলেট জেলা প্রশাসন। নগরীর টিলার পাদদেশে ঘর বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আড়াই শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। কিন্তু প্রশাসন থেকে কোনো ধরনের সতর্কতা কিংবা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন কিংবা নিরাপদে সরিয়ে নিতে নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট সদর উপজেলার আখালিয়া, ব্রাহ্মণশাসন, দুসকি, টিলারগাঁও, খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, বালুচর, টুকেরবাজার, পাঠানটুলা গুয়াবাড়ী জাহাঙ্গীরনগর, আখালিয়া বড়গুল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টিলাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘর বানিয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করছে কয়েকশ পরিবার। এর মধ্যে কেউ ঘর ভাড়া নিয়েছে, আবার কেউ নামমাত্র টাকা দিয়ে দখলদারদের কাছ থেকে জায়গা কিনে ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে নিম্ন আয়ের লোকজনই বেশি। বিভিন্ন টিলার পাদদেশে প্রায় ১০ হাজার লোকের বসবাস। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও রয়েছে বেশকিছু পাহাড়-টিলা। সেগুলোর পাদদেশেও ঘর বানিয়ে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে গত বছর প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। 

টুকেরবাজার ইউনিয়নের ভাটা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি টিলার প্রায় অর্ধেকই কেটে ফেলা হয়েছে। এর পাশেই অনেকে বহুতল ভবন ও টিনের ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন। আখালিয়া বড়গুল এলাকার একটি টিলায় বেশ কয়েক বছর ধরে বসবাস করে আসছে অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। টিলা কেটে বাড়ি তৈরি করায় দুর্বল হয়ে পড়েছে মাটির গঠন। তাই ভারি বর্ষণে তা ধসে পড়তে পারে যেকোনো সময়। ঝুঁকি জেনেও সেই টিলায় বসবাস করছে সহস্রাধিক লোক। তারা জানান, কম টাকায় জমি পাওয়ায় একটু ঝুঁকি নিয়েই ঘর বানিয়ে সেখানে থাকছেন।   

বড়গুল এলাকায় গেলে যে কারো চোখে পড়বে টিলা কেটে বাসাবাড়ি তৈরির দৃশ্য। 

স্থানীয়রা জানান, দু-একটি টিলা কেটে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পল্লী, যেখানে টিলা ড্রেসিং করে তৈরি করা হচ্ছে ঘরবাড়ি। সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা এসে আবাস গড়ছেন। জানতে চাইলে ওই টিলায় বসবাসকারী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আব্দুস সহিদ বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ঘরবাড়ি বানিয়ে পরিবার নিয়ে থাকছি। আমাদের যাওয়ার কোনো আর জায়গা নেই।’ 

খাদিমনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ছোট-বড় বেশকিছু টিলা রয়েছে। সেগুলোর পাদদেশে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বরাবরই তাদের সতর্ক করা হয়। তবে কে শোনে কার কথা। এবারো বর্ষণ শুরুর পর থেকে স্থানীয় ইউপি সদস্যদের দিয়ে তাদের সতর্ক করেছি। নিয়মিত খোঁজখবরও রাখছি।’ 

টুকেরবাজার ইউনিয়নের নালিয়া গ্রামে টিলা কেটে গড়ে উঠছে হাউজিং। গত দুই বছরে এ এলাকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। আখালিয়া বিজিবি ক্যাম্পের রাইফেলস ক্লাবসংলগ্ন টিলার নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী। অবাধে টিলা কাটায় অনেকগুলো এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১১ সালে আদালতে এক রিট থেকে সিলেটের ছয় উপজেলাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১ হাজার ২৫টি টিলার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। যদিও বাস্তবে এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনেক টিলার অস্তিত্বই নেই। ভূমিখেকোরা টিলা কেটে নিশ্চিহ্ন  করে ফেলছে। প্রশাসনের খুব একটা তদারকি নেই।’ 

শাহেদা আখতার বলেন, ‘টিলা কেটে ফেলায় প্রায়ই ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। টানা বৃষ্টিতে ঝুঁকি সৃষ্টি হলেও বাসিন্দাদের সতর্কতায় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে অন্তত ১০ হাজার মানুষ টিলার নিচে বসবাস করছে। ভারি বর্ষণ হলেই কেবল তাদের নিয়ে একটু কথাবার্তা হয়, পরে সবাই ভুলে যায়।’ 

সিলেট সদর উপজেলা খাদিমনগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজারসংলগ্ন রামপুর গ্রামে গত বছর ভারি বৃষ্টিপাতে টিলা ধসে তিনটি পাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনো পরিবারগুলো ওই এলাকায় আগের মতোই বসবাস করছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা কিংবা পাহাড়ের নিচে যাতে কেউ বসবাস না করে, তথ্য অফিসের মাধ্যমে সে ব্যাপারে সচেতনতার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ইমরান হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি জানান, তাদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই। সেই সীমিত জনবল দিয়েও মাঝেমধ্যে অভিযান চালান বলে দাবি করেন তিনি। 

সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিলেটে কয়েকদিন ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পূর্বাভাস রয়েছে আগামী ১৫ দিন সিলেটজুড়ে অতিবৃষ্টি হবে। এই ক’দিনে ১ হাজার ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে পুরো জেলায়। ফলে সিলেটে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শঙ্কা রয়েছে পাহাড়-টিলা ধসেরও। জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক হয়েছে। সবার কাছ থেকে নিজ নিজ উপজেলার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়ে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় বা টিলার পাদদেশে বসবাসকারীদের অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত সরিয়ে নেয়ার জন্যও প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।