সুনামগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই হাওরের শতভাগ বোরো ধান গোলায় তুলেছেন কৃষকরা। অন্য বছরের তুলনায় এবার বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ধানের দামও ভালো পাওয়ায় হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে। চলতি বছর সুনামগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলায় সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৬৫৯ টন। এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০৪ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহ করা হবে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। তবে এবার সরকারি খাদ্যগুদামে বোরো ধান বিক্রিতে কৃষকদের সাড়া নেই। এর মূল কারণ ফড়িয়া ও স্থানীয় বাজারে ধানের দাম ভালো থাকায় কৃষকরা নানা দুর্ভোগ সয়ে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে আগ্রহী নন। ফলে এখনো লক্ষ্যমাত্রার ২০ ভাগ ধানও সংগ্রহ করতে পারেনি জেলা খাদ্য বিভাগ।

সরজমিনে হাওরপারের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাওরে এবার ধান উৎপাদন ফলন ভালো হয়েছে। সব কৃষকরাই কম-বেশি ধান পেয়েছেন। কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই পুরো ফসল গোলায় তুলেছেন তারা। হাওরে কাটা-মাড়াই-উত্তোলনে আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন নিয়ে ধানক্ষেত-খলায় (ধান শুকানোর মাঠ) কাজ করেছেন। কেউ কেউ ধান কাটা-মাড়াই-উত্তোলনে লাগিয়েছেন স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদেরও। ধান কাটার শ্রমিক সংকটের শঙ্কা থাকলেও হারবেস্টিং মেশিনসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার দিয়েছে স্বস্তির নিঃশ্বাস। এসবের কারণে দ্রুত সময় হাওরের ধান কাটা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

বিগত কয়েক বছর বোরো ধান আবাদে হতাশার নাম ছিল ন্যায্যমূল্য। এবার ঠিক তার বিপরীত চিত্র। পাকা ধান ক্ষেতে থাকতে কৃষক মণপ্রতি দাম পেয়েছেন ৯০০-৯৫০ টাকা। তাই অনেকে খাদ্যগুদামে গিয়ে ধান দিতে আগ্রহী নন। কারণ তারা ধান নিয়ে গেলে ভেজা, চিটাসহ নানা কথা বলে খাদ্যগুদামের লোকজন হয়রানি করে। তাই কৃষকরা সামান্য লাভের জন্য গুদামে গিয়ে ধান দিয়ে চান না। হাওরের বাজারগুলোতে ও ফড়িয়াদের কাছে ধানের দাম ভালো পেয়ে নিজেদের স্বস্তিদায়ক বলে জানান কৃষক। ধান বেশি দামে কিনে আবার বিক্রি করতেও ভালো দাম পাচ্ছেন ব্যাপারীরা।

নাইনন্দার হাওরের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, এবার নাইনন্দার হাওরে ৩০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ফলন ভালো পেয়ে খুশি তিনি। কোনো ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশ না থাকায় স্বস্তিতে শতভাগ ধান গোলায় তুলতে পেরে প্রতিটি ঘরে সোনালি হাসি ফুটেছে। ধানের বাজার দামও ভালো।

রাসেল অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমদ বলেন, বাজারে ধানের দাম ভালো থাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ভালো দামে তারা ধান ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছেন। এতে তারা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি কৃষকরাও পাচ্ছেন ন্যায্যমূল্য।

সুনামগঞ্জ কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি শিক্ষাবিদ চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ধানের দাম বৃদ্ধিসহ ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ধান সংগ্রহের দাবি জানিয়েছি। আমাদের কৃষকদের দাবি না মানায় সরকার বোরো ধান সংগ্রহে কখনো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। নানা জটিলতার কারণে কৃষকরাও গুদামে গিয়ে ধান দিতে আগ্রহী নয়।

জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে এবার বোরো ধানের দাম নির্ধারণ করা ১ হাজার ৮০ টাকা (প্রতি কেজি ২৭ টাকা)। কিন্তু স্থানীয় বাজারে এখন ৯০০-৯৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি হচ্ছে। তাই কৃষকরা খাদ্যগুদামে এসে কষ্ট, দুর্ভোগ সয়ে গুদামে ধান দিতে তেমন আগ্রহী নন। তবে গুদামের কাছাকাছি যেসব কৃষক আছেন, তাদেরই ধান দিতে দেখা গেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন রেজা বলেন, বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক ধান দিতে পারবেন। কৃষকরা যাতে গুদামে এসে ধান দিতে পারেন, আমরা তাদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করছি।