নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে ‘অ্যাডপটিং আ মাল্টিসেক্টরাল অ্যাপ্রোচ ফর নিউট্রিশন’ (আমান) প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজারে ১৮ লাখ কিশোর-কিশোরী, নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুষ্টি সেবা গ্রহণে সহায়তা করা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ প্রকল্পটি পরিচালনা করা হয়। আজ মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে এ প্রকল্পের অর্জন ও বেস্ট প্র্যাকটিস উদযাপন করা হয়।

সেমিনারে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কক্সবাজার, যেখানে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এখানকার ২৯ শতাংশ শিশু কম ওজনের এবং ৩৬ শতাংশ শিশু খর্বকায়, যা শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির উচ্চমাত্রার প্রতিফলন। এছাড়া ৩৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং ৪০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে সহায়তা করতে এবং দুর্বল পরিস্থিতিতে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ উন্নত করতে, আমান প্রকল্প পুষ্টি কার্যক্রমের জন্য বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করেছে।

কানাডা সরকারের সহায়তায় পরিচালিত আমান প্রকল্পটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও বহুমুখী পুষ্টি কার্যক্রমের মাধ্যমে পুষ্টি সেবা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকল্পটি কক্সবাজারের আটটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়—স্বাস্থ্য, খাদ্য, মহিলা ও শিশু বিষয়ক, সমাজকল্যাণ, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করে একটি লিঙ্গ-সংবেদনশীল ‘বহুমুখী ন্যূনতম পুষ্টি প্যাকেজ’ (এমএমএনপি) তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা সমন্বয় কমিটিগুলো বার্ষিক লিঙ্গ-সংবেদনশীল পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেট বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ সহজতর করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকল্পটি নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তামূলক ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট প্রোগ্রাম’ এবং ‘ফুড ফ্রেন্ডলি প্রোগ্রাম’-এর পরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করেছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কেয়া খান। তিনি বলেন, ‘আমান প্রকল্প দেখিয়েছে, জনগণের পুষ্টির মানোন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। চলমান কর্মসূচির জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট আরো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।’

বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক, জাতীয় পুষ্টি সেবার লাইন ডিরেক্টরসহ সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন খাতের বিশেষজ্ঞরা প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, বহুমুখী পুষ্টি কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং লিঙ্গ ও পুষ্টি-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি উন্নতকরণের বিষয়ে আলোচনা করেন।

এএমএএন প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৬৪ জন গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মাকে প্রসবপূর্ব সেবা, পুষ্টি শিক্ষা, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সম্পূরক এবং পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। ৫ লাখ ৭০ হাজার ১২৩ জন পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের প্রয়োজনীয় নবজাতক ও শিশুর যত্নসেবা যেমন—প্রারম্ভিক ও বিশেষভাবে মায়ের দুধ খাওয়ানো, ভিটামিন এ সম্পূরক, ডায়রিয়ার চিকিৎসায় জিংক ও লো-ওসমোলারিটি ওআরএস প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০ জন কিশোরীর মধ্যে সাপ্তাহিক আয়রন ফলিক অ্যাসিড সম্পূরক গ্রহণের হার নিশ্চিত করা হয়েছে।

নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়কা সিরাজ বলেন, ‘আমান প্রকল্পটি এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছে যাতে পুষ্টি উন্নয়নে কোনো সুযোগ হাতছাড়া না হয়। এর মাধ্যমে আটটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনায় পুষ্টিকে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং বহুখাতভিত্তিক পুষ্টি উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাতের মাধ্যমে পুষ্টির উন্নতি সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশা করি, আমান প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য আগামী দিনে বহুখাতভিত্তিক পুষ্টি কার্যক্রমকে জাতীয় ও উপ-জাতীয় পর্যায়ে প্রসারিত করতে সহায়ক হবে।’

অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি, দাতা সংস্থা, সুবিধাভোগী, ফ্রন্টলাইন কর্মী ও বাস্তবায়নকারী অংশীদাররা উপস্থিত ছিলেন। তারা প্রকল্পের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেন এবং প্রকল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিমালায় সংযোজনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।