কোনো রকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) ধান বা গোল্ডেন রাইসের অনুমোদনে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছে পাঁচটি সংগঠন। এতে ধানের বীজের ওপর থেকে কৃষকদের অধিকার হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলো এমন অনুমোদনের জন্য সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ সংগঠনগুলোর।

গতকাল রাজধানীর প্রেস ক্লাবে পাঁচটি পরিবেশ ও কৃষক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত বক্তারা এমন আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন। আয়োজক সংগঠনগুলো হলো— উবিনীগ, বেলা, নয়া কৃষি আন্দোলন, নাগরিক উদ্যোগ, জিএম বিরোধী মোর্চা।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রধান বক্তব্য তুলে ধরে ফরিদা আক্তার বলেন, ‘সারা দেশে ব্রি২৯ প্রজাতির ধান কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এ প্রজাতির ধানের মধ্যে ভুট্টার জিন ঢুকিয়ে জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে গোল্ডেন রাইস উদ্ভাবন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ধানের ভেতর ভিটামিন এ থাকবে বলে দাবি করা হয়। তবে এটি অনুমাননির্ভর। এর ফলে স্বাস্থ্যের কী ধরনের ক্ষতি হবে তা নিরূপণ করা হয়নি। অনেক সময় বিদেশী কোম্পানিগুলো মিথ্যা প্রপাগান্ড চালাচ্ছে। আর এ পদ্ধতি অনৈতিক ও ক্ষতিকর হওয়ায় অনেক দেশেই এমন অনুমোদনের আবেদন করা হলেও তা সফল হয়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘এ প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে বীজের মেধাস্বত্ব চলে যাবে সিনজেনটা নামের একটি বহুজাতিক বীজ কোম্পানির কাছে। এ গোল্ডেন রাইস নিয়ে সারা বিশ্বে বিতর্ক রয়েছে। তাই ফিলিপাইনে এর অনুমোদন বাতিল হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের কোথাও অনুমোদন না পেলেও বাংলাদেশে গোল্ডেন রাইসের অনুমোদনের জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এমন অনুমোদনের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি ধানের আদি নিবাস বাংলাদেশে জনপ্রিয় একটি জাতের ধানের বীজের অধিকার হারাবেন কৃষকরা।

জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বেগুনের বিষয়ে ফরিদা আক্তার বলেন, ‘এর আগে ২০১৩ সালে সাতটি শর্ত সাপেক্ষে বিটি বেগুনের অনুমোদন দেয়া হলেও শর্তগুলো মানা হচ্ছে না। নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও কৃষকদের মধ্যে এমন বীজ জনপ্রিয়তা পায়নি। তাই কোনো অবস্থাতেই দেশে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। কীটনাশক ও অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর দু-তিন লাখ ক্যান্সার রোগী ধরা পড়ছে। জিএম পণ্য এমন স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।’

পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও অনুমোদন না পেলেও গোল্ডেন রাইস অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে দেশে। বাংলাদেশ এখন পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। এটার কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সামাল দেয়ার সক্ষমতা কি সরকারের আছে? এখানে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি জড়িত। এখানে রাজনীতি বিভক্ত থাকায় কোম্পানিগুলো সফলতার সম্ভাবনা বেশি মনে করে বাংলাদেশেই এমন অনুমতির জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। আর এখানে অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়া যথেষ্ট অস্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নয়। এর সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে তারা।’ 

বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. এমএ সোবহান বলেন, ‘এর পেছনে বাণিজ্য রয়েছে। প্রকৃতির ওপর জোর করা হলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। ভুট্টার জিন ধানে যুক্ত করা হচ্ছে, অথচ ভুট্টা খেলেই হয়। আর জিএম প্রযুক্তির সয়াবিনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অটিজম বেড়েছে বলেও বিভিন্ন সময় গবেষণায় উঠে এসেছে। ভারতেও জিএম কটন সফলতা পায়নি। তাই তারা পরে আর কোনো পণ্যের মধ্যে এ পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। সয়াবিনের নামে দেশে কী আসছে, আমরা জানি না।’

বীজের ওপর দখল নিতে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এমন তৎপরতা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। 

নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে জাকির হোসেন বলেন, ‘একটি খাবার থেকেই কেন সব ভিটামিন নিতে হবে? এতে ডাইভারসিটি বাধাগ্রস্ত হবে। ভিটামিনের জন্য আলাদা আলাদা ফল-ফসল রয়েছে।’ ইবনুল সাইয়েদ রানা বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতাল-নির্ভরতা বাড়ছে। ৪০-৫০ বছরে আগে সার কীটনাশক ছিল না। তখন এমন অবস্থা ছিল না। মোডিফায়েড খাবারের কারণেই এমনটা হচ্ছে কিনা।’