সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রতি বছরই নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হয় ফসল রক্ষা বাঁধ। প্রতিবারই এ কাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় হাওরের ফসল। যে বছর বৃষ্টিপাত ও ঢল বেশি হয়, সে বছর ফসলের ক্ষতি হয় বেশি। নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে এবার কাজ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই শতাধিক বাঁধের কাজে এখনো হাতই দেয়া হয়নি। ফলে এবারো ফসলহানির শঙ্কায় কৃষক।  

জানা যায়, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বাঁধ নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয় গত ১৫ ডিসেম্বর। এরপর এক মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু হয়নি অনুমোদিত দুই শতাধিক বাঁধে। আবার যেগুলোয় কাজ শুরু হয়েছে তার গতিও মন্থর। তাছাড়া এমনও অভিযোগ রয়েছে, বাঁধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত কিছু অসাধু ব্যক্তি অধিক মুনাফার লোভে অক্ষত বাঁধ কেটে নতুনভাবে তৈরি করছে। পুরনো বাঁধ কেটে আবার বাঁধেই মাটি ফেলারও অভিযোগ স্থানীয়দের। সম্প্রতি এমন কয়েকটি ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডসংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, ইঁদুর ও কাঁকড়ার গর্ত ভরাট এবং বাঁধের উপরিভাগ প্রস্তুত করতে মেশিন দিয়ে কিছু মাটি সরানো হচ্ছে। এ বিষয়ে পাউবোর শান্তিগঞ্জ উপজেলা কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন খান বলেন, ‘বাঁধের উপরিভাগ সমান করতে হয়। তাছাড়া পুরনো বাঁধে ইঁদুর-কাঁকড়ার গর্ত থাকে। কম্পেকশন করতে বাঁধ মেশিন দিয়ে আঁচড়াতে হয়। তবে এই বলে বাঁধের মাটি গভীর করে কাটা যাবে না। এমনকি পুরনো বাঁধ কেটে নতুন বাঁধ দেখানোর সুযোগও পাবে না কেউ।’ 

সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমের ফসল সুরক্ষায় কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অনেক বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি। অন্যদিকে জেলার ১২ উপজেলার বোরো ফসল সুরক্ষার জন্য এবার ৫৯১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ৭৩৩টি প্রকল্পে মোট ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। 

অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৭৬টির কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। যদিও এতে গরমিল রয়েছে দাবি করে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ তথ্য কেবল কাগজে কলমে। বাস্তবে দুই শতাধিক বাঁধে এখনো কাজ শুরু হয়নি। জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, খাওয়াজুড়ি হাওর, খাই হাওর ও সাংহাই হাওর ঘুরে গত মঙ্গলবার পুরনো বাঁধের মাটি কাটার সত্যতাও পাওয়া যায়। এদিকে জেলার বেশির ভাগ হাওরের জমিতে চাষাবাদ এখন শেষ পর্যায়ে। যেসব বাঁধে বিলম্বে কাজ শুরু হচ্ছে সময়মতো তা শেষ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে বোরো ফসল ঝুঁকিতে থাকবে এমন মন্তব্য কৃষকদের। 

সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার দেখার হাওরের কৃষক রজব আলী বলেন, ‘সরকার বাঁধের জন্য টাকা দিয়েছে, কিন্তু এখনো কাজই শুরু হয়নি। দেরিতে কাজ শুরু হলে তা সময়মতো শেষ হবে না। এদিকে ধানের চারা রোপণের কাজ শেষ। এখন বাঁধ ঠিক না হলে অকালবন্যায় তা ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ 

বাঁধের কাজ শুরু না হওয়ায় বোরো ফসলের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন। পিআইসি গঠনে ব্যাপক অনিয়ম ও সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ার প্রতিবাদে সম্প্রতি মানববন্ধনও করেছে সংগঠনটি। 

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের এক মাস পার হয়ে গেলেও অনেক বাঁধে কাজ শুরু হয়নি। আমাদের সংগঠনের তথ্যমতে, এখনো দুই শতাধিক বাঁধে কোনো কাজ শুরু হয়নি। অনেক হাওরে আবার নামমাত্র কাজ হচ্ছে। এতে ফসলের সুরক্ষা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। দ্রুত সময়ে কাজ শুরু না হলে আমরা মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচির ডাক দেব।’ 

দু-একদিনের মধ্যে সব বাঁধে কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট পিআইসিদের তাগাদা দেয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক মনিটরিং হচ্ছে।’ 

সংশ্লিষ্ট পিআইসিদের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী। বাঁধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ‘কৃষকের পরিশ্রমের ফসল নিরাপদে ঘরে না তোলা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। কোনো অনিয়মই সহ্য করা হবে না।’