অভাবের তাড়নায় কিংবা পারিবারিক দায়িত্বে অনেকেরই স্বপ্ন হোঁচট খায়। কিন্তু কিছু মানুষ স্রোতের বিপরীতে হেঁটে প্রমাণ করেন, ইচ্ছা থাকলে বয়স বা সামাজিক প্রতিকূলতা কখনই বাধা হতে পারে না। ৫৩ বছর বয়সী গৃহবধূ শেফালী বেগম তেমনই এক অদম্য প্রাণশক্তির নাম। নানা বাধা পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে জিপিএ ৪.২১ অর্জন করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামে বাসিন্দা শেফালী বেগম। মাত্র ১১ মাস বয়সে বাবাকে হারানোর পর তার পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। তবে তার শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল বেশ সম্ভাবনাময়। কিন্তু আর্থিক সংকটে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই ইতি ঘটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার। এর মাঝেই অল্প বয়সে বিয়ে হয় শেফালী বেগমের। অথচ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় বরাবরই ভালো ফলাফল করেছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতায় পড়াশোনার সেই ধারা দীর্ঘকাল থমকে থাকে।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩২ বছর। তিন সন্তানের জননী হিসেবে এ সময়ে সংসার সামলেছেন তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে মনের কোণে সুপ্ত থাকা পড়াশোনার স্বপ্নটি কখনো নিভে যায়নি। নিজের ভাগনি ও সন্তানদের লেখাপড়া দেখে নতুন করে জেদ চাপে তার মনে। স্বামী মকছেদুল আলম ও সন্তানদের অকুণ্ঠ সমর্থনে ২০২০ সালে গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন।
বয়সের ব্যবধান কিংবা সামাজিক নানা কৌতূহল—কোনো কিছুতেই দমে যাননি শেফালী। সংসারের সব কাজ, রান্না ও গৃহস্থালি সামলে গভীর রাতে শুরু হতো তার পড়াশোনা। বাড়িতে কোনো প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন না। নিজের অদম্য জেদ আর প্রচেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। অনেক সময় জটিল ইংরেজি বা অংকের বিষয়গুলো নিজের ছেলেমেয়েদের কাছে শিখে নিয়ে রাত জেগে পড়ালেখা করতেন। দীর্ঘ এ লড়াইয়ের ফলও মিলেছে হাতেনাতে। ২০২৩ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে এসএসসি পাস করার পর এবার উচ্চ মাধ্যমিকেও পেলেন দারুণ সাফল্য।
শেফালীর এ সাফল্যে কেবল তার পরিবার নয়, পুরো এলাকাবাসী গর্বিত। তার বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকতায় যুক্ত, ছোট ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং মেয়ে মাকছুরা খানম রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। সন্তানদের সুশিক্ষিত করার পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণের এ লড়াইকে অনেকেই দেখছেন এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম জানান, এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। আইন বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তার। বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সে নতুন করে পথচলা শুরু করা যায়, শেফালী বেগম আজ তারই জীবন্ত প্রতীক।










