রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে চারদিনের ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে একদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বিকালে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকার এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা বেগমের সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। বেলা ২টা ২২ মিনিটের দিকে দুই আসামিকে আদালতে নেয়া হয়। পরে তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় এবং শুনানির সময় আদালতে তোলা হয়। রিমান্ড আবেদনে পুলিশ পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে। এর মধ্যে রয়েছে—মরিয়ম গলায় ফাঁস দেয়ার সময় আসামিরা বাসায় ছিলেন কিনা এবং আত্মহত্যায় তাদের কোনো প্ররোচনা ছিল কিনা; তারা ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ বা ভয়ভীতি দেখিয়ে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন কিনা; মামলার পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ও অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেফতার; অজ্ঞাত কোনো আসামি জড়িত কিনা তা শনাক্ত করা এবং মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন।
এদিন বেলা ৩টা ১২ মিনিটের দিকে তাদের পঞ্চম তলার এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তাদের হাতকড়া, হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল। আসামিদের কাঠগড়ায় নেয়ার পর এসব খুলে দেয়া হয়। বিচারক এহসানুল ইসলাম ৩টা ১৫ মিনিটে এজলাসে ওঠেন। মামলার শুনানি শুরু হলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শামসুজ্জোহা রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিনের আরজি জানান। তিনি বলেন, ‘দুই আসামির মধ্যে একজন রানিং এমপি, আরেকজন জামায়াতের কর্মী। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা। নজরুল ইসলাম চারবারের এমপি। এ মামলায় তাদের রিমান্ডে নেয়ার মতো বিন্দুবিসর্গ কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা। আমরাও মৃত্যুর বিচার চাই। তবে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে তাদের জামিন দেয়া হোক। আমরা সবকিছুতে সহযোগিতা করব। পালিয়ে যাওয়ার মতো লোক আমরা নই।’
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘মামা ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়ে করেন এমপি নজরুল ইসলাম। বিয়ের ব্যাপারে প্রথম স্ত্রীকেও রাজি করান। ওই মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল, মোটেলে যাওয়ার ভিডিও দেখা যায়। তারা ন্যাম ভবনে বাস করতেন। ২০ তারিখে মরিয়ম আত্মহত্যা করে। সুইসাইড নোটও পাওয়া যায়। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িয়ে দিতে পারি না। সবকিছুতে পূর্বপরিকল্পনা ছিল। আমরা শুনে এসেছি, জামায়াতে ইসলামীর লোক সৎ।’ এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এ মামলার ঘটনায় থাকি। পলিটিক্যাল বিষয়ে না যাই।’ পরে কৌঁসুলি ফারুকী বলেন, ‘সৎ লোকের শাসন দেখছি। তাদের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।’
গত রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীতে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল, মাকছুদা ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে গতকাল দুপুরে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে গাজী নজরুল ফেসবুক পোস্টে মরিয়মকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। এরপর সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে জানিয়ে ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে বিরোধী দল পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।










