পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ট্রেন সার্ভিস চালুর পর টিকিটের চাহিদা তুঙ্গে। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে এককভাবে ট্রেন ভাড়া করে কক্সবাজারে পিকনিক আয়োজনের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে একটি স্পেয়ার রেক বা ট্রেন তৈরি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পাশাপাশি আগামী ২৬ মে থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস এসি-নন এসি কেবিন যুক্ত করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১ ডিসেম্বর থেকে ট্রেন সার্ভিস চালুর পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সম্পূর্ণ ট্রেন ভাড়া করে কক্সবাজার ভ্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। রেলওয়ের সীমিত সক্ষমতা সত্ত্বেও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এ ধরণের সুবিধা দিয়েছে রেলওয়ে। দিন দিন ভাড়ায় একটি সম্পূর্ণ ট্রেন ভাড়া করে কক্সবাজার ভ্রমণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরিয়ান কোচ দিয়ে ১৮/৩৬ কম্পোজিশনের একটি স্পেয়ার রেক (স্পেশাল ট্রেন) তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ। ট্রেনটি স্পেয়ার হিসাবে ঢাকায় অবস্থান করার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিন, রাষ্ট্রীয় টানা কয়েক দিনের বন্ধের সময় বিশেষ ট্রেন হিসাবে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা যাত্রী পরিবহন করবে।
এছাড়াও চাহিদা অনুযায়ী ঢাকা থেকে প্রতিদিন চলাচলরত কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে চাহিদা থাকা সাপেক্ষে স্পেয়ার রেক থেকে কোচ নিয়ে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করবে রেলওয়ে। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে দীর্ঘদিন পর এসি ও নন এসি কেবিন যুক্ত করতে যাচ্ছে রেলওয়ে। যাত্রী চাহিদার কথা বিবেচনা করে ট্রেন দুটিতে মানসম্মত এসব কোচ যুক্ত করে ১৮/৩৬ কম্পোজিশনের রেক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একইভাবে কোরিয়ান নতুন কোচ দিয়ে গোধূলি/তূর্ণা এক্সপ্রেস (ট্রেন নং-৭০৩/৭৪২) ট্রেনের জন্য ১৮/৩৬ এর রেক, মহানগর প্রভাতী ও তূর্ণা এক্সপ্রেস (৭০৪/৭৪১) ট্রেনের জন্য ১৮/৩৬ এর রেক কম্পোজিশন তৈরি করেছে রেলওয়ে।
কোরিয়ান কোচের রেক দিয়ে বিভিন্ন ট্রেনের রেক পুন:বিন্যাস ও স্পেয়ার রেক গঠনের বিষয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগ থেকে একটি প্রস্তাব রেল ভবনে পাঠানো হয় গত ২৯ এপ্রিল। ১৩ মে রেলভবনের উপ-পরিচালক (টিটি) মো. শওকত জামিল মোহসী প্রস্তাবটি অনুমোদন করে আগামী ২৬ মে থেকে কার্যকর করতে চিঠি দেন।
মূলত কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন টাইপের কোচ দিয়ে কক্সবাজার এক্সপ্রেস, পর্যটক এক্সপ্রেস চালু করা হয়। এছাড়া সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসেও কোরিয়ার কোচের নতুন রেক দেয়া হয়। লট ভিত্তিক বিভিন্ন ধাপে আমদানি হওয়ার কারণে শেষ দিকে ডব্লিউজেসি ৩০টি কোচের মধ্যে ২৮টি ও ডব্লিউএফসি ৬টি কোচ জিআইবিআর (গভর্মেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে) অনুমোদন করেছে। এ কারণে দীর্ঘদিন নতুন কোরিয়ান কোচের রেক দিয়ে যাত্রী পরিবহন করা সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে এসি ও নন এসি কেবিন কোচ সংযোজন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ের নতুন কোচগুলো আসার কারণে সেগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনে সংযোজনের পরিকল্পনা ছিল রেলের। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন পাওয়ায় আগামী ২৬ মে থেকে সোনার বাংলা, সুবর্ণ, কক্সবাজার ও পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে যুক্ত করা হবে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজার রুটের যাত্রীরা আগের চেয়ে বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রেলওয়ের এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে ১টি নন-এসি কেবিন ও ৩টি এসি কেবিন যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়াও এ ট্রেনটিতে ৫টি এসি চেয়ার, ৬টি শোভন চেয়ার এবং দুটি খাবার গাড়ি-গার্ডব্রেকসহ শোভন চেয়ার কোচ যুক্ত থাকবে। এতদিন কক্সবাজার ও পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে শুধুমাত্র শোভন চেয়ার ও এসি চেয়ার থাকলেও নতুন কম্পোজিশনে ৩টি করে এসি কেবিন কোচ যুক্ত করা হচ্ছে। ১৬/৩২ রেকের ট্রেন দুটিতে আরো থাকবে তিনটি শোভন চেয়ার, ৭টি এসি চেয়ার ও দুটি খাবার গাড়িযুক্ত শোভন চেয়ার কোচ।
এদিকে প্রভাতী (৭০৪), গোধূলি (৭০৩) ও তূর্ণা এক্সপ্রেস (৭৪১/৭৪২) ট্রেন ৪টিতে নতুন কোরিয়ান কোচের মধ্যে থাকছে ১টি নন এসি কেবিন, ৩টি এসি কেবিন, ৫টি শোভন চেয়ার, ৬টি এসি চেয়ার ও ২টি খাবার গাড়ি-গার্ডব্রেক সহ শোভন চেয়ার কোচ যুক্ত করা হচ্ছে।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রী পরিবহন খাত থেকে আয় বাড়াতে চাইছে। সর্বশেষ ৪ মে থেকে যাত্রীবাহী ট্রেনে আরোপ থাকা রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রেনের স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশনের অতিরিক্ত কোচ সংযোজন হলেও সেসব কোচের টিকিটের শোভন চেয়ারে ২০ শতাংশ, প্রথম শ্রেণীর টিকিটে ৩০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায় করবে। এছাড়া আসন সংরক্ষণের মাধ্যমে কামরা বা কোচ বুকিং দিয়ে টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ২০-৩০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায় করবে। এ ভাবে রেলওয়ে বছরে যাত্রী পরিবহন থেকে ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় বাড়াতে চায়।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে টিকিটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দুটি আন্ত:নগর ট্রেনের পাশাপাশি আরও ৫টি বিশেষ ট্রেন চালিয়েছিল রেলওয়ে। ২০, ২৮, ২৯ ফেব্রুয়ারি ও ৬ ও ৭ মার্চ ঢাকা ও কক্সবাজারের মধ্যে ট্রেনগুলো যাত্রী পরিবহন করে। এছাড়াও শীতকালীন মৌসুমে কক্সবাজারে যাত্রী চাহিদা বেড়ে যাওয়া, পর্যটন নগরীতে বিভিন্ন পিকনিক, কনফারেন্স, মিনিট সহ বিভিন্ন ভ্রমণে করপোরেট টিকিট বা ট্রেনের চাহিদা বেড়েছে। উদ্বোধনের পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে এ ধরণের বেশ কয়েকটি ট্রেন ভাড়া দেয়া হলেও কোচ ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে নিয়মিত বিশেষ এ সার্ভিসটি চালাতে পারছিল না রেলওয়ে। এজন্য বিশেষ একটি রেক নির্দিষ্ট করে ভাড়ায় চালানোর জন্য প্রস্তুত করেছে রেলওয়ে।










