এ বছর চারদফা বন্যার কারণে সুনামগঞ্জের হাওড়গুলো এখনো পানিতে টইটম্বুর। অন্যান্য বছর এ সময় পানি নেমে গেলেও এবার তা নামছে ধীরগতিতে। এতে হাওড়ে এবার বোরো ধানের আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

কৃষকরা বলছেন, হাওড়ে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ ও পানি নামার পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পানি দেরিতে নামায় জেলার বিভিন্ন হাওড়ে এখনো বীজতলা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। যে গতিতে পানি নামছে তাতে হাওড়ের জমি আবাদ উপযোগী হতে আরো ১৫ থেকে ২০ দিন লেগে যেতে পারে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, চারদফা বন্যার কারণে এবার হাওড়ে অনেক বেশি পানি প্রবেশ করেছে। তাই পানি নামতে দেরি হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই হাওড়ের সব পানি নেমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পাউবোর কর্মকর্তারা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, চারদফা বন্যার কারণে এবার হাওড়ের পানি নামতে দেরি হচ্ছে। হাওড়ের পানি যেন দ্রুত নেমে যায়, সেজন্য আমরা জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় হাওড় রক্ষাবাঁধের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা কেটে দিচ্ছি এবং খালগুলোও খনন করা হচ্ছে। বাঁধ কেটে দেয়ায় দ্রুত পানি নামছে। কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে পানি নেমে যাবে। কৃষকরাও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বোরো ধান রোপণ করতে পারবেন।

সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়, সদর উপজেলার দেখার হাওড়, বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওড়, দিরাই উপজেলার বরাম হাওড়, কালিয়াকোটা হাওড়, দোয়ারাবাজারের খানলার হাওড় ও শাল্লা-নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, ছায়ার হাওড়সহ জেলার ছোট-বড় সবকটি হাওড়ে পানি থৈ থৈ করছে। এর মধ্যে কয়েকটি হাওড়ে ধীরগতিতে পানি নামতে শুরু করেছে। সময়মতো হাওড়ের পানি না নামলে বোরো ফসল নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছেন কৃষকরা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবারের বোরো আবাদের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে।

পানি না নামায় বোরো ধান চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেখার হাওড়পাড়ের তাজপুর গ্রামের কৃষক ইফসুফ আলী বলেন, অন্যান্য বছরের মতো এবারো সাত বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করব। কিন্তু পানি নামছে না। দেখার হাওড়ে একটু পানি নেমেছে। বীজতলা শুকিয়েছে। বীজতলায় দেরিতে বীজ বপন করেছি। হাওড়ে এখনো যে পরিমাণ পানি রয়েছে, তা নামতে আরো ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে।

দেখার হাওড়ে এবার ১৮ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদের জন্য বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাজপুর গ্রামের আরেক কৃষক জিয়া উদ্দিন। তিনি বলেন, অন্য বছর কার্তিক মাসে বোরো আবাদের বীজতলার কাজ শেষ হয়। কিন্তু এবার অগ্রহায়ণ শেষ হতে চললেও হাওড়ের পানি কেবল নামতে শুরু করেছে। আর যে গতিতে পানি নামছে, তাতে এবার হয়তো বোরো ধান পাকার আগে বন্যায় তলিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

শনির হাওড়ের বশির উদ্দিন, ইসহাক মিয়াসহ একাধিক কৃষক বলেন, গত বছর এ সময়ে শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়ে বোরো আবাদ শুরু হয়েছিল, কিন্তু এবার তার উল্টো। এখনো হাওড় থেকে পানি নামছে না। গত ৩০ নভেম্বর হাওড় রক্ষাবাঁধের পিআইসি গঠনের মেয়াদ শেষ কিন্তু এখনো হয়নি। সময়মতো বোরো ধান গোলায় তোলা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তারা।

বোরো মৌসুমে এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা ইকবাল আজাদ। হাওড়ে একটু ধীরে পানি নামছে। সোমবার পর্যন্ত জেলায় ৯ হাজার ২৮৩ হেক্টর বীজতলা প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা আশা করছি ১৬-১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে হাওড়ের নিচু ও উঁচু জমিতে বোরো ধান রোপণ করা শুরু হবে। আমরা অল্পদিনে উচ্চফলনশীল আগাম জাতের বোরো ধান ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ৮৮, হাইব্রিড লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছি কৃষকদের। তাই কৃষকদের আহ্বান করব আগাম জাতের ধান আবাদ করলে দ্রুত সময়ে পেকে যাবে ও ফলনও ভালো হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ৪২টি হাওড়ে ১২ হাজার ৭ কিলোমিটার ফসল রক্ষাবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এ বছর। হাওড়ে বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ২২টি জরিপ টিম প্রি-ওয়ার্ক করছে।