সমাজের মূল ধারা থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে মৌলভীবাজারের চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। ঘনবসতি ও স্থান সংকুলানের অভাবে গাদাগাদি আর নোংরা পরিবেশেই তাদের বাস। চরম দরিদ্র এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ছে যক্ষ্মা রোগের ঝুঁকি। জেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ রোগী শনাক্ত হয় এর অন্তত ৩০ শতাংশই চা জনগোষ্ঠীর মানুষ। অনুন্নত জীবন ও পরিমিত খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগার কারণেই তাদের মধ্যে যক্ষ্মার হার তুলনামূলক বেশি বলে জানান চিকিৎসকরা।
মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ৯৪৭ জন। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ বা ১ হাজার ২১১ জনই চা শ্রমিক। বছর শেষে এ হার আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৯৮ রোগী শনাক্ত হলেও চা বাগানের বাসিন্দা ছিল ১ হাজার ৯৯৪ জন বা ৩২ শতাংশ। জেলায় ২০২০ সালে ৪ হাজার ৬৮৬ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ৩১৫ জন বা প্রায় অর্ধেকই চা বাগান অধ্যুষিত এলাকার।
চিকিৎসকরা জানান, চা বাগান এলাকার বাসিন্দাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম। এর কারণ তাদের নিম্ন জীবনমান, একসঙ্গে অনেক লোকের গাদাগাদি করে বসবাস ও অপুষ্টি। তবে যক্ষ্মা শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়ায় এমন না, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলেই এর ঝুঁকি বাড়ে। রোগ কিংবা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসেও যক্ষ্মার জীবাণু আক্রমণ করতে পারে। মরণঘাতী এ রোগ সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়ায় এবং দেহে প্রবেশ করে প্রথমে ফুসফুসে আশ্রয় নেয়। আক্রান্তদের হাঁচি-কাশি, কখনো কথা বলার সময়ও বাতাসে যক্ষ্মার জীবাণু ছড়ায়। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। তবে আক্রান্ত সব রোগীর কাছ থেকেই যে জীবাণু ছড়ায়, বিষয়টি এমন নয়।
যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা হিড বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মেডিকেল অফিসার ডা. সুবোধ দাস পলাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যক্ষ্মার উপসর্গগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, ওজন হ্রাস, জ্বর ও রাতে শরীর ঘামা। এসব উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি। আর চা শ্রমিকদের বসবাসের পরিবেশ নিম্নমানের। দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে এরা পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে না। ফলে এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি।’
স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক অন বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি বুক ২০১৯-এর তথ্যমতে, দেশের ১৬৬টি চা বাগানে স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৭। অস্থায়ী চা শ্রমিকের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৪৩৭ এবং চা জনগোষ্ঠীর মানুষ ৪ লাখ ৭২ হাজার ১২৫ জন। তবে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। তাদের দাবি, অস্থায়ী ও বেকার চা শ্রমিকের সংখ্যা স্থায়ী চা শ্রমিকের প্রায় দ্বিগুণ। আর চা জনগোষ্ঠী সাড়ে সাত লাখেরও বেশি। এদের দুই-তৃতীয়াংশ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে বসবাস করে। সে অনুযায়ী চায়ের রাজধানীখ্যাত এ জেলার ৯০টি চা বাগানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বাস।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। প্রতি লাখে এ রোগে ২২৫ জনের মৃত্যু হলেও মৌলভীবাজারে এ হার অনেক বেশি। ২০ লাখ মানুষের এ জেলায় ২০২০ থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫০৩ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যুহার প্রতি লাখে ২৫০ জনের মতো। আর চা বাগানগুলোয় বছরে শনাক্তের হার গড়ে দুই হাজার, মৃত্যুহারও প্রায় দ্বিগুণ।
চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চা বাগানে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকেই নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর থেকে এখনো বাইরে বের হতে পারছে না। ঘনবসতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস, মাদকাসক্তি, প্রয়োজনীয় খাবার সংকট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবাদিপশুর সঙ্গে একই ঘরে বসবাস করছেন শ্রমিকরা। তাছাড়া অধিকাংশ চা শ্রমিক অসচেতন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সংকটও রয়েছে, যার কারণে তাদের মধ্যে যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ রোগের প্রবণতা অনেক বেশি।’
চা শ্রমিকরা একই ঘরে ৮-১০ জন কাজ করায় যক্ষ্মার জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই চা বাগানগুলোয় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে জানিয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক্স-রে যন্ত্র নিয়ে সপ্তাহে পাঁচদিন চা বাগানগুলোয় যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হচ্ছে। এ কারণেই তাদের মধ্যে রোগ নির্ণয়ের হার বেশি। তবে যক্ষ্মা নির্মূল করা সম্ভব নয়। যেহেতু এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়, এজন্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ ভাগ রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।’
সিভিল সার্জন আরো বলেন, ‘চা বাগানগুলোর অনেক বাসিন্দা অপুষ্টিতে ভোগে। এ কারণে সেখানে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা চা শ্রমিক ও বাসিন্দাদের নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও কার্যক্রমে কফ পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিনামূল্যে দেয়া হয়।’










