টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে সব ধরনের শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুনর্বাসন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর বিকাশ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে ফেনীতে কর্মে নিয়োজিত শিশুদের পুনর্বাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর থেকে ১০টি শিশুর তালিকা করা হলেও পুনর্বাসনে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন বেকারি, হোটেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা-টমটম ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে শিশুরা কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে জেলা পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী ও এনজিও প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। তবে তাদের কার্যক্রম কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে শিশুশ্রম ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসকের দাবি, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর শিশুশ্রম প্রতিরোধ কমিটি করে কার্যক্রমও শুরু করেছেন। আগামীতে এর প্রতিফলন ঘটবে।
ফেনীর বিসিক শিল্পনগরীর কোয়ালিটি জুট মিলে তিন বছর ধরে কাজ করছে ফারিয়া আক্তার (১৩)। ২০২০ সালে তার বাবার সঙ্গে মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তখন সে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। বাবা বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। মা সুলতানা আক্তার পাশের বাড়িতে কাজ নেন। তবে মায়ের অসুস্থতায় তাদের সংসারে অভাব দেখা দেয়। তখন দূরসম্পর্কের এক বোনের মাধ্যমে চাকরি পায় ফারিয়া আক্তার। তার বেতন দিয়েই সংসার চলছে। তারও স্কুলে যেতে ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে মন চায়। চাকরির কারণে সেটা আর হয়ে ওঠে না।
ফেনী শহর ও আশপাশের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ ঘুরে দেখা গেছে, জেলায় সবচেয়ে বেশি শিশু নিয়োজিত রয়েছে হোটেল, বেকারি ও ইটভাটায়। কর্মে নিয়োজিত শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশই রয়েছে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া আরো প্রায় ৫০টি খাতে কর্মরত রয়েছে শিশুরা। যে বয়সে খেলাধুলা আর পড়ালেখায় মনোযোগী হওয়ার কথা, সে বয়সেই শিশুরা কর্মে জড়িয়ে পড়ছে। তবে এক্ষেত্রে অভিভাবকের সচেতনতা ও অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফেনীর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাদের কর্মপরিধির একটি অংশ হচ্ছে কারখানায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। শিশুশ্রম প্রতিরোধে কারখানা মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিধানও রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশুশ্রম শাখার প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে ফেনীতে ১৭ সদস্যের জেলা শিশুশ্রম পরিবীক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নিয়মিতই ওই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সদস্যভুক্ত সরকারি দপ্তর ও এনজিও প্রতিনিধিরা সভায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে তাদের পরিকল্পনা এবং বাস্তাবায়নকৃত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
ফেনী কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগের শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) রোমান মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শনের সময় আমরা শিশুশ্রমের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখি। এরই মধ্যে বিসিক শিল্পনগরীর একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ১০টি শিশুর তালিকা করে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে পুনর্বাসনের জন্য। এছাড়া আমাদের কার্যালয় থেকে শিশুশ্রম বন্ধে পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।’
জেলা সমাজসেবা বিভাগের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন, ‘কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা কোনো তালিকা বা চিঠি পাইনি।’
পরে ২৮ মে স্বাক্ষরিত চিঠি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দেখালে সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি ৯ জুন পর্যন্ত ফেনীতে অফিস করেছি। ১০ জুন থেকে ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণে রয়েছি। ২৮ মে স্বাক্ষরিত চিঠি ৯ জুন আমাদের হাতে না আসা দুঃখজনক। তার পরও আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তালিকায় নাম রয়েছে নাহিদা আক্তারের (১৩)। তার মা ফিরোজা আক্তার বলেন, ‘আমি ও আমার মেয়ে একই কারখানায় দুই-তিন বছর ধরে কাজ করছি। মেয়েকে সহায়তা বা পুনর্বাসনের জন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি দপ্তর যোগাযোগ করেনি। পারিবারে ভাতের জোগান কেউ দিতে পারলে, মেয়েকে আমি কাজ করতে দেব না।’
ফেনীর বিভিন্ন হোটেলে দুই বছর ধরে কাজ করছে কামরুল (১৫)। তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ২০২১ সালে মারা যান। তখন সে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। বাবা মারা যাওয়ার তার বড় চার ভাই পড়ালেখার খরচ বন্ধ করে দেয়। অভাবের কারণে সে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো শুরু করে। তবে এ কাজে পরিশ্রম বেশি হওয়ায় হোটেলে চাকরি নেয়। সকাল ৬টা থেকে রাত পর্যন্ত হোটেলে কাজ করে যে টাকা পায়, সেটা সে মায়ের হাতে তুলে দেয়। ভালো ফুটবল খেলত কামরুল। এখনো তার মন চায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে। কেউ দায়িত্ব নিলে আবারো পড়ালেখা করতে চায় কামরুল।
সার্বিক বিষয়ে জেলা শিশুশ্রম পরিবীক্ষণ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক শাহীনা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেনীতে শিশুশ্রম প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম কাগজে-কলমে চলছে; বাস্তবে নেই—বিষয়টি এমন নয়। আমি যোগদান করার পর কার্যক্রমটি শুরু করেছি। জেলা কমিটি গঠন করেছি; এরই মধ্যে কয়েকটি সভাও করেছি। এখন কাগজে দেখা গেলেও আগামীতে বাস্তবেও দেখা যাবে। ক্রমান্বয়ে জেলায় শিশুশ্রম প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। সেজন্য আমাদের একটু সুযোগ দিতে হবে।’










