বাজারে দেশী মাছের বড় অংশই আসে হাওরাঞ্চল থেকে। প্রাকৃতিকভাবে বংশ বিস্তার ও খাবার গ্রহণ করায় এসব মাছ বেশ সুস্বাদু। যে কারণে হাওরের মাছের চাহিদাও বেশি। তবে দখল-দূষণ আর ইজারাদারদের অনিয়ন্ত্রিত আহরণে মাছের সেই প্রাপ্যতা কমে আসছে। হাওরে অবাধে মাছ শিকার হচ্ছে দেশের অন্যতম হাওর জেলা সুনামগঞ্জেও। এখানকার বিল সেচে মাছ ধরছেন ইজারাদাররা। এতে একদিকে দেশীয় মাছের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পানির অভাবে সেচ দিতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাওরের বোরো চাষীরা।

সুনামগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৫৪টি হাওর রয়েছে। একেকটি হাওরে ২০টি পর্যন্ত বিল আছে। যার অধিকাংশই ইজারা দেয়া। জাল দিয়ে মাছ ধরার জন্য এ ইজারা নেন তারা। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদাররা বিলের পানি শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে শুকিয়ে অবাধে মাছ শিকার করেন। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন যেমন হুমকিতে পড়েছে, তেমনি জেলার শত শত হেক্টর বোরো আবাদের জমির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধরমপাশা, দিরাই, শাল্লাসহ প্রায় সব উপজেলায় হাওরের বিলে অবাধে মাছ শিকার চলছে। স্থানীয় প্রশাসন বিল সেচে মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও কার্যত এটি বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়েই বিল সেচে মাছ ধরা বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাওরাঞ্চলে দেশী মাছের বংশ বিস্তার থাকবে না বলে মনে করছেন হাওর ও পরিবেশবিদরা।

সম্প্রতি জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের পাকনা হাওরের আয়লা বিলসহ অনেকগুলো বিল শুকিয়ে মাছ ধরার খবর পাওয়া গেছে। আয়লা বিলের ওপরের অংশে প্রায় ৫০০-৭০০ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে বিলের পানির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি। কিন্তু সেচ দিয়ে বিলে মাছ শিকার করায় এসব জমিতে আবাদ করা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিল শুকিয়ে মাছ ধরতে তারা বাধা দিলেও সেটি মানছেন না ইজারাদার ও তাদের লোকজন।

সেচ দিতে না পেরে জামালগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির বোরো ক্ষেত শুকিয়ে গেছে। এ এলাকার উদ্বিগ্ন কৃষকরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আবার জরিমানা ও সাময়িক ব্যবস্থা কার্যত কোনো কাজেই আসছে না। এজন্য ইজারাদারদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আয়লা বিলের ওপরের অংশে কিছু জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। কিন্তু বিল সেচে মাছ ধরার কারণে জমিতে পানি দিতে পারছি না। ধানের চারা নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। শুধু আমার নয় আরো অনেক কৃষকের জমি পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে।

এ মৌসুমে ৬০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়েছেন কৃষক আব্দুল আলী। তিনি বলেন, এমনিতে হাওরে পানিস্বল্পতা থাকে। তার ওপর এখন বিল সেচে মাছ ধরার কারণে পানিই পাওয়া যাচ্ছে না। সেচ দিতে না পেরে ধানের চারায় লালচে রঙ এসেছে। সেচ না দিলে চারা মারা যাবে। কিন্তু হাওরের ইজারাদারের লোকজন আয়না বিল শুকিয়ে ফেলছে। এতে আমরা কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।

কয়েক মাস আগে প্রায় ৮ লাখ টাকায় চৈত্র মাস পর্যন্ত আয়লা বিলটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বরাদ্দ নেন আল মামুন নামে এক ইজারাদার। নিয়ম অনুযায়ী, ইজারাদাররা জাল দিয়ে মাছ শিকার করতে পারেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার আল মামুন বিল সেচে মাছ ধরার জন্য সোহেল মিয়া নামের এক ব্যক্তির কাছে বিলটি সাব-লিজ দেন। তিনি বিলটি সেচে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি বন্ধ করা হয়। তবে বিলটি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে চাটনি বিলসহ জেলার আরো অনেক বিলের।

এ ব্যাপারে ইজারাদার আল মামুন বলেন, আয়লা বিলের ওপরের অংশে স্থানীয় কিছু জেলে জাল দিয়ে মাছ ধরতে অনুমতি নিয়েছিলেন। জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে বাঁধ দেয়া হয়েছিল। তবে পানি সেচতে তারা মেশিন লাগালে খবর পেয়ে আমি তাত্ক্ষণিক মেশিন বন্ধ করাই। আমার বিলে মেশিন দিয়ে বিল শুকানো হচ্ছে না।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের জামখালা হাওরের বাঁচাডুবি বিল শুকিয়ে মাছ ধরার অভিযোগ ওঠে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে। এখনো অরক্ষিত রয়েছে হাওরটি। এছাড়া ধরমপাশা উপজেলার বাগবাড়ী বিল শুকিয়েও সম্প্রতি মাছ ধরেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ নিয়ে উপজেলা প্রশাসন বরাবর অভিযোগও করেন স্থানীয়রা।

হাওর নিয়ে কাজ করা সংস্থা হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বণিক বার্তাকে বলেন, বিল শুকিয়ে মাছ ধরা নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতি বছরই প্রশাসনকে ঘুমিয়ে রেখে বিল শুকিয়ে মাছ ধরে ইজারাদার ও তার লোকজন। প্রশাসনের লোকজন এসব দেখে না দেখার ভান করেন। দিন দিন বিল শুকিয়ে মাছ ধরায় হাওরের দেশী মাছের বংশবিস্তার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে হাওরের বোরো ধানের ক্ষতিও হচ্ছে। মা মাছসহ হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমি মনে করি প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব এ বিষয়ে বলেন, প্রায় বিল শুকিয়ে মাছ ধরার অভিযোগ ওঠে। আমরা চলতি বছর ১৫টি শ্যালো মেশিন জব্দ করেছি। যেখানেই বিল শুকিয়ে মাছ ধরার খবর পাই, সেখানে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিল শুকালে হাওরের বোরো ফসলও হুমকির মুখে পড়ে। তার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না। বিল শুকিয়ে মাছ ধরা অপরাধ। যেকোনো সময় বিল শুকিয়ে মাছ ধরলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আগামীতে তারা যেন বিল ইজারা না পায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একই কথা জানান জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কেউ যদি বিল শুকিয়ে মাছ ধরে, আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আমাদের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা আছে, যেন কোনোভাবে বিল শুকিয়ে কেউ মাছ ধরতে না পারে। তার পরও আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। এ রকম হয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।