ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে গতকাল শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ (ডিইউআরএস), সেন্টার ফর রিসার্চ ইন মাল্টিডিসিপ্লিন (সিআরএম) এবং সেন্টার ফর সাইকোলজিকাল হেলথ (সিপিএইচ) এর যৌথ উদ্যোগে 'জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী সময়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা' শীর্ষক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে মূল গবেষণাপত্রের কাজ ও ফলাফল উপস্থাপনা করেন এর গবেষক সাদিয়া শারমিন ও মাহাদী আল মোরশেদ। তারা গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে বলেন, জুলাই বিপ্লবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা।

জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা যারা অন্তত ৫ দিন এই আন্দোলনে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকরা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, এই তিন মাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, এবং রাজশাহী অঞ্চলে গবেষণার কাজ পরিচালনা করেন।

গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, পুরুষ ও নারী উভয় শিক্ষার্থীর মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি), হতাশা ও উদ্বেগের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

ফলাফল অনুযায়ী, পিটিএসডির হার নারীদের মধ্যে বেশি, যেখানে ৭৬.৫২ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী গভীর মানসিক চাপে ভুগছেন, যা পুরুষদের (৭২.৯০ শতাংশ) তুলনায় বেশি। মাঝারি থেকে গুরুতর পিটিএসডির হারও নারীদের মধ্যে বেশি পাওয়া গেছে, যেখানে ৫৭.০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী গুরুতর পিটিএসডির শিকার। অথচ পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪৮.৩১ শতাংশ।

হতাশার হারও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ন্যূনতম থেকে মৃদু মাত্রার হতাশা অনুভব করেছেন, তবুও গুরুতর হতাশার শিকার ৩৫.৪ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ২১.৬১ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, অনেক শিক্ষার্থী সামান্য হতাশার শিকার হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ গুরুতর হতাশায় ভুগছেন, যা তাদের পড়াশোনা এবং সামগ্রিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় আরো পাওয়া যায়, পুরুষদের মধ্যে ৮৬.৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গভীর উদ্বেগে ভুগছেন, যেখানে নারীদের মধ্যে এই হার আরো বেশি, ৯২.৬৮ শতাংশ। গুরুতর উদ্বেগ ৭১.১২ শতাংশ নারী এবং ৬৬.২৮ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাওয়া গেছে— যা প্রমাণ করে, উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপ্লবোত্তর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য পরিমাপ করা। মানসিক স্বাস্থ্যর অনেক দিক থাকলেও উদ্বেগ, হতাশা ও পিটিএসডিকে সামনে রেখে এই গবেষণার কাজ পরিচালনা করা হয়। এ গবেষণায় ১৭ থেকে ২৮ বছর বয়সী ৩৭৫ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে ২৬ জন ডাটা সংগ্রহকারীদের প্রায় ৩ মাস সময় লেগেছে।

গবেষকদ্বয় মনে করেন, এই গবেষণা একেবারেই প্রারম্ভিক; এর থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সকল প্রতিষ্ঠান আরো গবেষণার কাজ করবে এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে নিজ নিজ পরিমণ্ডলে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা শুরু হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তা না হলে শিক্ষার্থীদের এই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক সময় ধরে চলমান থাকলে পরবর্তী জীবনে এর বেশ প্রভাব পরবে বলে গবেষকদ্বয় মত প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জুলাই বিপ্লবের সময় মানুষের আত্মত্যাগ ও সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত ও বিষণ্ণতার কারণ হয়েছিল। আন্দোলনে আহত কিংবা প্রিয়জন হারানো ব্যক্তিরা এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এমনকি যারা বাসায় থেকে সব দেখেছেন, তারাও ওইসব ঘটনা দেখে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যথেষ্ট অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যথাযথ স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না, যা তাদের মানসিকভাবে আঘাত করছে। এছাড়াও, বিপ্লবে প্রথম সারিতে থাকা মেয়েদের অবদান যথেষ্ট প্রশংসিত হচ্ছে না, যা তাদের মনে হতাশার সৃষ্টি করছে। তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং পরিষেবা প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেন এবং বাড্ডা, বাসিলা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন রেড জোনে গবেষণা চালানোর আহ্বান জানান।