বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার অজপাড়াগাঁ শাঁওইল মধ্যপাড়া। জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমের এ গ্রামে ঢুকলেই কানে ভেসে আসে ‘ঠকঠক’ শব্দ। দিনে-রাতে এ শব্দ তুলে প্রায় প্রতিটি ঘরেই বোনা হয় কম্বল, চাদর, শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, থ্রিপিসসহ রঙিন সব বস্ত্র। শুধু শাঁওইলই নয়, আশপাশের গ্রামগুলোর প্রায় ৪০ হাজার লোক আজ স্বনির্ভর এ তাঁত শিল্পকে ঘিরে। তাদের বেশির ভাগই পুরনো আর ফেলনা সুতা থেকে তৈরি করেন নতুন কম্বল ও শীতের পোশাক।
জানা যায়, শাঁওইল মধ্যপাড়া বর্তমানে তাঁত শিল্পের গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানকার তাঁতি সম্প্রদায় স্বাধীনতার পরপর গামছা ও লুঙ্গি তৈরি করে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করত। চাহিদা বাড়ায় পরে তা সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। আবার এ অঞ্চলে শীতকালে গরম কাপড়ের বেশ চাহিদা থাকায় পুরনো কাপড় দিয়ে কম্বল তৈরি শুরু করেন তাঁতিরা। ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে গ্রামের কয়েকজন কারিগর কম্বল বানানোর তাঁত মেশিন স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করেন। তাদের দেখে গ্রামের অনেক বেকার লোকজনও তাঁত শিল্পে নিজেদের জড়িয়ে স্বাবলম্বী হন। এখন গ্রামের প্রায় সব পরিবারই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে সেখানে তৈরি হওয়া চাদর, কম্বল, গামছা, তোয়ালেসহ নানা ধরনের বস্ত্র সারা দেশে বিক্রি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে রফতানি হয় মধ্যপ্রাচ্যেও।
শীতের পোশাক তৈরির পর স্থানীয়ভাবে সপ্তাহের রোববার ও বুধবার একটি হাট বসে। প্রতি হাটেই বেচাবিক্রি হয় কোটি টাকার বস্ত্র। দামে কম বলে এ অঞ্চলের কম্বলের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে। তাছাড়া শীতে দুস্থদের মাঝে বিতরণের জন্য প্রতি বছরই সরকারিভাবে কম্বল কেনা হয়। এনজিও, ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিও শীতবস্ত্র কিনে বিতরণ করে থাকে। এসব পোশাকের সিংহভাগই আসে বগুড়ার শাঁওইল হাট থেকে।
অক্টোবর থেকে জানুয়ারি—এ চার মাস চাহিদা বেশি থাকায় সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় কাটে কারিগরদের। গার্মেন্টসের ফেলে দেয়া সুতা, পুরনো সোয়েটার ও ঝুট কাপড় থেকে সুতা বের করে বিভিন্ন ডিজাইনের চাদর ও কম্বল বোনেন তারা। প্রথম দিকে গ্রামের পুরুষরাই কেবল এ কাজ করলেও এখন নারীরাও যুক্ত হয়েছেন। গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে তাঁতযন্ত্র। কোনো কোনো ঘরে দুটি থেকে শুরু করে পাঁচটি পর্যন্ত তাঁত রয়েছে। কোনোটি চাকাওয়ালা আবার কোনোটি তৈরি করা হয়েছে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে।
শাঁওইল গ্রামের প্রবীণ তাঁত কারিগর মোজাহার হোসেন, মকবুল হোসেন, আব্দুল হামিদ, ফজলুর রহমান, আফজাল হোসেন, মীর কাশেম আলী। তারা জানান, সারা দেশে লাখ লাখ তাঁত বন্ধ হয়ে গেলেও বগুড়া অঞ্চলের হাজার হাজার তাঁত এখনো টিকে আছে চাদর ও কম্বল বুনন করে। এ অঞ্চলের তৈরি বাহারি ডিজাইনের বিভিন্ন চাদর ও কম্বল সারা দেশে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। দাম কম বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে এখানকার বস্ত্র কিনে নিয়ে যান। সব মিলিয়ে শাঁওইলসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ তাঁত চালিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে। তবে বর্তমানে কিছুটা অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁতশিল্পীরা।
নশরতপুর ইউনিয়ন তন্তুবায় সমবায় সমিতির সদস্যরা বলছেন, এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এতে তারা লাভবানও হয়েছেন। তবে সহজ শর্তে ঋণ দিলে এ ব্যবসা আরো বড় করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়াতে হবে ঠিক তেমনি কমাতে হবে সুদের হার। এসএমই ফাউন্ডেশন থেকেও আরো বেশি করে ঋণ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাঁত কারিগর আয়শা আক্তার জানান, তিনি একটি তাঁত মেশিন বসিয়ে চাদর বোনেন। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি তাঁত বাড়াতে ঋণ নেয়ার কথা ভবছেন বলে জানান।
চাদর তৈরির কারিগর রেজাউল করিম জানান, আগে লাভ হতো বেশি। এখন রঙ ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় কম্বল তৈরিতে বেশি খরচ পড়ছে। এর পরও গ্রামের সবাই নিজেদের তাগিদে কম্বল ও চাদর বুনে যাচ্ছেন। পাশাপাশি গামছা, সোয়েটার, হাতমোজা, শিশুদের জন্য বিভিন্ন ডিজাইনের শীতের কাপড়ও তৈরি করছেন তারা। সুতা কেটেও জীবিকা নির্বাহ করেন শাঁওইলসহ আশপাশের অর্ধশত গ্রামের মানুষ।
কারিগররা বলেন, তাঁত শিল্প তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ সবাই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতবস্ত্র তৈরির কাজ করেন তারা। আর এ কাজে আঁচ, নলি, আকু, চরকা, চরকি, লাটাই, সুতা, রঙসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। কাজ ভাগাভাগি করে নেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ লাটাই, চরকি ও ড্রাম ঘুরিয়ে সুতা গোছানোর কাজ করেন, আবার কেউ কম্বল-চাদর তৈরির কাজ করেন। অধিক পরিশ্রম করলে একটি তাঁতযন্ত্র দিয়ে দিনে ৮-১০টি কম্বল তৈরি করা যায়। আবার চাদর বানানো যায় দিনে ১০টি এবং গামছা তৈরির যন্ত্র দিয়ে তৈরি করা যায় ১৫-২০টি গামছা। কিছু ব্যবসায়ী কম্বল ও চাদর গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট কিছু পরিবার বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র তাদের সংগ্রহ করে দেয়। অন্যরা তাদের পণ্য বিক্রি করেন গ্রামের হাটে।
শাঁওইল হাট ও বাজার কমিটির সভাপতি আতোয়ার হোসেন শেখ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আদমদীঘির তৈরি শীতবস্ত্রের মধ্যে চাদর, কম্বল ও বিভিন্ন ধরনের মোজা সারা দেশে কেনাবেচা হয়। তবে ইদানীং কিছু তরুণ উদ্যোক্তা ভারতে ও মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছেন। এটা অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে রফতানি না। শীতকাল ছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ১ কোটি টাকার ওপর শীতবস্ত্র বিক্রি হয়ে থাকে। আর শীতকালে বিক্রি হয় তার তিন গুণ। সব মিলিয়ে প্রতি বছর গড়ে ২০-২২ কোটি টাকার শীতবস্ত্র বিক্রি হয় এ অঞ্চলে। তবে আরো বড় পরিসরে ভালোমানের পণ্য তৈরিতে সহজ শর্তে ঋণ দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘শাঁওইল বাজারে প্রায় ১ হাজার ৮০০ দোকান আছে। প্রতি দোকানের আওতায় গড়ে তিনজন করে নারী শ্রমিক কাজ করেন। সে হিসাবে এ শিল্পের সঙ্গে কেবল নারী শ্রমিকই জড়িত রয়েছেন পাঁচ হাজারের মতো।’
আদমদীঘির শাঁওইল হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার উন্নয়নে ২০১৪ সাল থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে। উদ্যোক্তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি পণ্যের ডিজাইন উন্নত করার লক্ষ্যে ‘প্রডাক্ট ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট’ প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ পরিচালনা করে আসছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আদমদীঘি উপজেলার শাঁওইল গ্রামেই শুধু না, আশপাশের আরো শতাধিক গ্রামে শীতবস্ত্র তৈরি ও বিক্রি হয়। এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে বড় একটি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দরিদ্র পরিবার বস্ত্র তৈরির কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। বগুড়া চেম্বার থেকেও তাদের বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করা হয়। আগামীতেও কোনো প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করা হবে।’










