খরস্রোতা বাসিয়ার উৎপত্তি সুরমা নদী থেকে। সিলেটের জালালাবাদ থানার মাসুকগঞ্জ বাজার থেকে শুরু করে বাসিয়া মিশেছে কুশিয়ারার সঙ্গে। কিন্তু ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর উভয় প্রান্ত ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বাসিয়া এখন মৃতপ্রায় এক নদী। একই দশা হবিগঞ্জে সুতাং নদীরও। শিল্প-কারখানার বর্জ্যে সুতাংয়ের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, সিলেট বিভাগের চার জেলায় প্রায় ১০০টি নদ-নদী রয়েছে, দখল-দূষণের কারণে যেগুলো শুষ্ক মৌসুমে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে রয়েছে ১৬৮টি। এসব নদ-নদীর মধ্যে সিলেটে ৩৫টি, সুনামগঞ্জে ৯৭, মৌলভীবাজারে আট ও হবিগঞ্জে রয়েছে ২৮টি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) হিসাব অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের ১৬৮টি নদ-নদীর মধ্যে প্রায় ১০০টি শুষ্ক মৌসুমে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া এ বিভাগের ৩১টি নদ-নদীর অবস্থা সংকটাপন্ন।

বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহ সাহেদা আখতার জানান, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, ডাউকি, পিয়াইন, ধলাই, লোভা, সারি, বাসিয়া ও চেঙ্গেরখাল নদী সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। সুনামগঞ্জের ধোপজান, যাদুকাটা, নলজুর, বৌলাই, রক্তি, চেলা, খাশিয়ামারা, কুশিউড়া, মাহরাম, মহাসিং ও বোকা নদী অস্তিত্ব হারানোর পথে। মৌলভীবাজারের ধলাই, মনু, জুড়ী, কণ্ঠীনালা ও গোপলা নদী এবং হবিগঞ্জ জেলার খোয়াই, সুতাং, সোনাই, বরাক, কাষ্টি ও করাঙ্গী নদীর অবস্থাও বিপন্ন। তিনি বলেন, ‘অবৈধভাবে বালি-পাথর উত্তোলন, বিভিন্ন ধরনের দূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ ও নদী দখল করে অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদ-নদীগুলো সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।’

স্থানিয়া জানান, বাসিয়া নদী বেহাল হয়েছে মূলত দখলের কারণেই। নদী দখলমুক্ত করতে ২০১৭ সালে স্থানীয় প্রশাসন ১৮৭ জনের নামে মামলা করে। যখন মামলার রায়ের সময় ঘনিয়ে আসে তখন দখলদাররা আদালতে রিট করলে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থমকে যায়। ফলে বাসিয়া আজও দখলমুক্ত হয়নি। সিলেট মহানগরীর ভেতর দিয়ে ২৬টি ছড়া বা খাল বয়ে গেছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এসব খালে প্রতিদিন ন্যূনতম ৫০ টন বর্জ্য ফেলা হয়। 

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমি সন্তান বাংলাদেশ’-এর সংগঠক শুয়াইব হাসান বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ১৭টি সিলেট বিভাগে। বাংলাদেশমুখী এসব নদীর অধিকাংশে ভারত সরকার বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এর প্রভাব সিলেট অঞ্চলে নানাভাবে পড়ছে। নদীগুলো ভারসাম্য হারাচ্ছে।’

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপারের প্রতিনিধি জাকির হোসেন সোহেল বলেন, ‘নদ-নদীর এ পরিণতির জন্য হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাটের অপরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল অনেকাংশে দায়ী।’

অন্যদিকে ‘সারি নদী বাঁচাও আন্দোলন’-এর সভাপতি আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, ‘সিলেটের সীমান্তবর্তী নদীগুলো থেকে বালি উত্তেলন হচ্ছে। বালি উত্তোলনই নদীগুলোর জন্য অন্যতম হুমকির কারণ।’

তিনি বলেন, ‘বাসিয়া নদীর উৎসমুখ খনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। পিয়াইন, ডাউকি, ধলাই, লোভা, সারি নদী ও উতমাছড়া নদী থেকে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে এখনো বন্ধ হয়নি। এজন্য অভিযান আরো জোরদার করতে হবে।’ 

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনা আক্তার বলেন, ‘বাসিয়া নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ বিষয়ে আমরা সবাই কাজ করছি।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বাসিয়াকে পুরনো রূপে ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। নাব্যতা ফেরাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’

এ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিলেট নগরীর কুশিঘাট থেকে বিশ্বনাথের দশগ্রাম পর্যন্ত খননকাজ চলছে। আগামী জুনে কাজ শেষ হবে।’