টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সিলেটের সব নদ-নদীর পানি বাড়া অব্যাহত রয়েছে। কয়েক দিন ধরে পানি বাড়তে থাকলেও গতকাল পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় পানিবন্দি পাঁচটি উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি।
জেলা প্রশাসন বলছে, বন্যার্তদের জন্য ৪৭০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় ত্রাণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার বেশির ভাগ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে গেছে। কোনো কোনো ঘরে কোমর সমান পানি। আবার অনেকের ঘর একেবারেই ডুবে গেছে। প্রধান প্রধান সড়ক প্লাবিত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অনেকে ঘরের মালপত্র রেখে আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছেন না। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্নার সুযোগও নেই। ঘরে শুকনো খাবারও নেই। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় অনেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছে।
জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে উপজেলার অনেক ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। এ কারণে অনেকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চাইলেও নৌকার অভাবে পারেননি। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালিক রুমাইয়া বলেন, ‘বুধবার রাতের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দিনে পানি একটু কমতে শুরু করলেও আবারো বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে পানি কমছে না। পরিস্থিতির উন্নতিও হচ্ছে না। বন্যাকবলিতরা আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের উঁচু স্থাপনাতেও আশ্রয় নিয়েছে। জেলা থেকে পাওয়া ত্রাণ ছাড়াও আমরা ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করছি। সেগুলো বন্যার্তদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।’
একই অবস্থা কোম্পানীঞ্জেও। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষ এরই মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ১০০টি নৌকা রয়েছে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারের জন্য।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনজিত কুমার চন্দ বলেন, ‘উপজেলার প্রায় ছয়টি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে। মানুষজন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠছে। তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে আনার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে নৌকা রয়েছে।’
এদিকে কানাইঘাট উপজেলার একটি ইউনিয়ন ছাড়া বাকি আটটিই প্লাবিত হয়েছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ভারতের বরাক নদী দিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি স্থানে ডাইক ভেঙে গেছে। এতে জকিগঞ্জের চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৪০-৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন বলছে, উপজেলার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ২৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৩৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর আবাদি জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫০ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি উপজেলার জন্য ১ হাজার বস্তা শুকনো খাবার, ৭৫ টন চাল, ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলায় ৪৭০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে গোয়াইনঘাটে ৫৬, জৈন্তাপুরে ৪৮, কানাইঘাটে ১৮, কোম্পানীগঞ্জে ৩৫ ও জকিগঞ্জে ৫৮টি রয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনী। প্রয়োজন হলেই তারা তৎপরতা শুরু করবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোবারক হোসেন।
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গতকাল বিকালে কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমার পানি বিপৎসীমার ১৪ দশমিক ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। শেওলা পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি বিপৎসীমার ১৩ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার, অমলশীদ পয়েন্টে ১৭ দশমিক ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া সারিঘাট পয়েন্টে সারি নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩ দশমিক ১৮ সেন্টিমিটার, গোয়াইনঘাট পয়েন্টে ১১ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ইসলামপুর পয়েন্টে ধলাই নদের পানি বিপৎসীমার ১০ দশমিক ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জে ৬৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণে সিলেটের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতির কবে উন্নতি ঘটবে, সেটা বলা যাচ্ছে না।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে সেনাবাহিনীকে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা নামবে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।’










