রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়া এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস (আউটলুক) ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স রেটিংস। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা বা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডি’স।

গত দুই বছর ধরেই মুডি’স-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ‘নেতিবাচক’ পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এ পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে দিয়েছিল। তবে গতকাল (মঙ্গলবার) মুডি’স থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ফের ‘স্থিতিশীল’ করার বিষয়টি জানানো হয়।

প্রকাশিত মূল্যায়নে সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’ বহাল রেখেছে। এক্ষেত্রে মুডি’স-এর ভাষ্য, যে ঝুঁকিগুলোর কারণে বাংলাদেশের পূর্বাভাস নেতিবাচক করা হয়েছিল, সেগুলো এখন ‘বি২’ রেটিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।

মুডি’স বলেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস পেয়েছে এবং নির্বাচিত সরকারের শক্তিশালী জনমতের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, তুলনামূলক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বহিঃখাতের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এতে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ও সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে।

বহিঃখাতের অর্থায়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে দেখছে মুডি’স। আইএমএফের পরবর্তী ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান থাকার বিষয়টিও এক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে বলা হয়, আইএমএফসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান সম্পৃক্ততা, বৈদেশিক অর্থায়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের সভরেন ক্রেডিট রেটিং (সার্বভৌম ঋণমান) অবনমনের পাশাপাশি ঋণমান নিয়ে নানা নেতিবাচক বার্তা দিয়ে আসছিল। এক্ষেত্রে মুডি’স ছাড়াও ঋণমান নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি এবং ফিচ রেটিংসও একাধিকবার বাংলাদেশের ঋণমান অবনমন করার পাশাপাশি পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ের শেষের দিকে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে দেয়া হয়। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ (B+) এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ (B) অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। আর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘ঋণাত্মক’ করেছিল।

এসঅ্যান্ডপি, মুডি’স ও ফিচ রেটিং—যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ তিন ঋণমান নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান একত্রে ‘বিগ থ্রি’ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের ক্রেডিট রেটিং বাজারের সিংহভাগই এ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এ তিন প্রতিষ্ঠানের রেটিংয়ের ওপর কোনো দেশের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। ঋণমানের অবনমন ঘটানোর অর্থ হলো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা আগের চেয়ে দুর্বল হয়েছে। টানা তিন বছরের হতাশ কাটিয়ে এবারই প্রথম বাংলাদেশের ঋণমান নিয়ে ইতিবাচক বার্তা তথা ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ পূর্বাভাস দিল মুডি’স।

মুডি’স-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ, তুলনামূলক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং আগের বাজার বিকৃতি দূর করার ফলে রিজার্ভের এ উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছে মুডি’স।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়া প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এরপর বিনিয়োগ ও শিল্প কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে ২০২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। মুডি’স-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে এবং পরে ধীরে ধীরে কমবে।

ইতিবাচক পূর্বাভাস সত্ত্বেও বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রাখার পেছনে ব্যাংক খাতের বড় ধরনের ঝুঁকি অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে মুডি’স। এর সঙ্গে দেশের সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি ও দুর্বল ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। মুডি’স-এর মূল্যায়নে, ব্যাংক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক মূলধন পর্যাপ্ততা পুনরুদ্ধারে মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ পুনঃমূলধনের প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণের এ প্রয়োজন সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা সীমিত এবং অর্থায়নের জন্য দেশীয় ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে বলে মনে করছে মুডি’স।

তবে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংক খাতের আমানত প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। এ প্রবণতা থেকে মুডি’স মনে করছে, ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা তারল্য নয়; বরং মূলধন ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ঘাটতি বা সলভেন্সি।

বাংলাদেশের রাজস্ব ভিত্তি মুডিস’-এর আওতাধীন সার্বভৌম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সংকুচিত। এর ফলে সরকারের আর্থিক নীতি পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত থাকছে। সরকারের মোট ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ হলেও রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। প্রাথমিক ঘাটতি অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংক খাতকে সহায়তার সম্ভাব্য ব্যয়ের কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারি ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মুডি’স। তবে স্বল্প সুদের কনসেশনাল অর্থায়নে বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবেশাধিকার থাকায় ঋণের ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে দেখছে মুডি’স। সম্প্রতি একটি এলএনজি আমদানি টার্মিনালে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার উৎপাদনে সংকট তৈরি হয়েছিল।

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণও অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে মুডি’স। সংস্থাটির মতে, এলডিসি উত্তরণের পর রফতানি প্রতিযোগিতা এবং স্বল্প সুদের কনসেশনাল অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের রফতানির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছে মুডি’স।

সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবেলায় প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির কার্যকারিতার উন্নতি বাংলাদেশের ঋণমান বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে খাতটির দায় সরকারের ঘাড়ে বড় পরিসরে চলে আসা, প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব পরিস্থিতির অবনতি, বৈদেশিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার কমে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ফিরে এলে বাংলাদেশের ঋণমানের ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

এদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে মুডিস’-এর মূল্যায়নকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সহকারী মুখপাত্র সাঈদা খানম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মুডি’স-এর মূল্যায়নকে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ স্থিতিশীল পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং দেশের সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বাস করে।’