জটিল ম্যালিগন্যান্ট ব্রেইনস্টেম গ্লিওমায় আক্রান্ত ১৮ বছর বয়সী এক রোগীর সফল চিকিৎসা সম্পন্ন করেছে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম। সক্রিয় ভেন্টিলেটর সাপোর্টে (কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস) থাকা অবস্থায় ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সফলভাবে সম্পন্ন করার এ চিকিৎসা বাংলাদেশে প্রথম।

গতকাল এক প্রেস মিটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ চিকিৎসার ইতিহাস, রোগীর বর্তমান অবস্থা, রোগের জটিলতা এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে।

সেখান থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এই জটিল রোগে ভুগলেও সম্প্রতি রোগীর দ্রুত স্নায়বিক অবনতি ঘটে। তার শরীরের বাম পাশ দুর্বল হয়ে পড়ে, কথা বলতে সমস্যা (ডিসফেসিয়া) দেখা দেয় এবং খাবার গিলে খাওয়ার সময় বারবার শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসনালীতে খাবার প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় পরিবারের সদস্যরা তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে যান।

সেখানে হঠাৎ করেই রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তিনি তীব্র কার্ডিওরেসপিরেটরি ফেলিউরে আক্রান্ত হন এবং জরুরি ভিত্তিতে তাকে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনে নেয়া হয়। পরবর্তীতে সেখানে চিকিৎসা অব্যাহত রাখা সম্ভব না হওয়ায় লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই পরিবারের সদস্যরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

চট্টগ্রামে ফিরে গুরুতর অবস্থায় অবিলম্বে রোগীকে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের মেডিকেল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এমআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। এসময় হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী রোগীর অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরিবারের পূর্ণ সম্মতিক্রমে তিনি মেডিকেল আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই রেডিওথেরাপি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সক্রিয় ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা একজন সংকটাপন্ন আইসিইউ রোগীকে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সফলভাবে প্রদান করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া, যা বাংলাদেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইসিইউ ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ দলের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে সফলভাবে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট থেকে বের করে আনা হয় এবং পরবর্তীতে শ্বাসনালীর ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব অপসারণ করা হয়। গিলে খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে আসার পর নাকের এনজি টিউব খুলে দেয়া হয় এবং তিনি স্বাভাবিকভাবে মুখে খাবার গ্রহণ শুরু করেন। পাশাপাশি গেজ ফিজিওথেরাপি এবং বিশেষায়িত পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগী ওয়াকারের সহায়তায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সক্ষমতা অর্জন করেন। চিকিৎসা শেষে কনট্রাস্ট এমআরআই ফিউশন পরীক্ষায় টিউমারের উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।

এ প্রসঙ্গে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের রেডিওথেরাপি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটরে থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ আইসিইউ পরিবেশে রেডিওথেরাপি প্রদান চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।’

এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের মেডিকেল সার্ভিসেস ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানের জটিল ক্যান্সার চিকিৎসা প্রদান সম্ভব।’

হাসপাতালের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সামির সিং বলেন, ‘এ ধরনের জটিল ক্যান্সার চিকিৎসায় শুধু আধুনিক প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দক্ষতা এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের ভিজিটিং সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি) প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ; রেডিওথেরাপি সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর (মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি) ডা. তানভীর আহমেদ; কনসালট্যান্ট (মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি) ডা. হাসনিনা আক্তার; অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট (মেডিকেল এন্ড রেডিয়েশন অনকোলজি) ডা. নয়ন ভৌমিক; সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ইন্টারনাল মেডিসিন ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার) প্রফেসর ডা. এ এ এম রাইহান উদ্দিন এবং অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন) ডা. শেখ উল আলম।—সংবাদ বিজ্ঞপ্তি