বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ভাড়া, সিন্ডিকেট সমস্যা ও ধর্মঘটের কারণে পণ্যের ট্রাক আটকে দেয়াসহ নানা কারণে মাঝে মধ্যেই দুর্ভোগ পোহাতে হতো দুই দেশের ব্যবসায়ীদের। তবে রেলপথে পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকায় সেই ভোগান্তি কমতে শুরু করেছে। এতে করে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ভাড়া ও রাজস্ব বাবদ বিপুল পরিমাণ আয় হচ্ছে রেলওয়ের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে এ খাত থেকে রাজস্ব ও ভাড়া বাবদ দ্বিগুণ আয় করতে পারবে রেলওয়ে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের বনগাঁ পৌরসভার কালিতলায় আমদানীকৃত পণ্যবাহী ট্রাক দিনের পর দিন পার্কিংয়ে রেখে একটি সিন্ডিকেট নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিল। ওই পার্কিং থেকে চুক্তির মাধ্যমে ৩০-৪০ হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে বেনাপোল বন্দরে ট্রাক পাঠাতেন সিন্ডিকেট সদস্যরা, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বাংলাদেশী আমদানিকারক ও ভারতের রফতানিকারকরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। পণ্য চালানে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বাজারেও। এর বাইরে দুদিন পর পর নানা কারণে ধর্মঘটে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কালিতলা থেকে প্রতিদিন কোন ট্রাক বাংলাদেশে আসবে তা তারাই ইচ্ছামতো নির্ধারণ করে দেয়ালে কাগজ সেঁটে দেন। এতে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আমদানীকৃত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় শিল্প কার্যক্রমও ব্যাহত হয় চরমভাবে। ট্রাকচালকরাও এ প্রক্রিয়ায় লোকসানে পড়েন।

এ পরিস্থিতিতে ও করোনা মহামারীর বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের কাস্টমস, রেল মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা গত বছরের ৪ জুন রেলপথে পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এ সিদ্ধান্তের আগে কেবল কার্গো রেলের মাধ্যমে ভারত থেকে সপ্তাহে একটি বা দুটি চালান আসত। আবার কখনো দেখা গেছে, মাসে একটি রেলও আসছে না।

তবে করোনার মধ্যে রেলপথে পণ্য আমদানির এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। বর্তমানে প্রতিদিন কার্গো রেল, সাইডোর কার্গো রেল এবং পার্সেল ভ্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে। এতে সরকারের যেমন রাজস্ব আয় হচ্ছে, তেমনি রেলেরও বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আহরণ হচ্ছে। ফলে কমছে ট্রাক চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। সময় ও খরচ সাশ্রয় হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

বেনাপোল রেলস্টেশন সূত্রে জানা যায়, স্থলবন্দর দিয়ে রেলপথে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৮২২ কোটি টাকার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫৪ টনের মতো পণ্য আমদানি হয়েছে, যা থেকে সরকার ২৬১ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে। অন্যদিকে রেল কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাবদ ২ কোটি ৮৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আয় করেছে। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ পথে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয় ১ লাখ ৮৪ হাজার টনের মতো, যা থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৮ কোটি ৮৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

রেলওয়ের বেনাপোল স্টেশন মাস্টার শাহিদুজ্জামান জানান, বর্তমানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে স্থলপথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রেলপথে পণ্য আমদানি হচ্ছে। যদিও বন্দরের রেল ইয়ার্ড না থাকায় পণ্য রাখতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে বন্দরে দুটি রেল ইয়ার্ড নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। আশা করা যায়, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।

তিনি আরো জানান, আগে এ পথে চাল, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো মরিচ, পাথর ও ফ্লাই অ্যাশ আমদানি হতো। বর্তমানে বিভিন্ন প্রসাধনী পণ্য, ডেনিম ফ্যাব্রিকস, পিকআপ, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে। রেলপথে এভাবে পণ্য আমদানি অব্যাহত থাকলে এ বছর রেল খাতে সরকারের রাজস্ব দ্বিগুণ আদায় হবে।

রেলপথে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি পাওয়াকে ব্যবসার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরাও। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ভারতীয় ট্রাক পার্কিং সিন্ডিকেট জিম্মি করে রেখেছে। ভারতীয় হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন মহলে আবেদন করার পরও আমরা কোনো সমাধান পাচ্ছি না। তবে বর্তমানে রেলপথে সব ধরনের পণ্য আমদানি সচল রয়েছে। এতে গত বছরের তুলনায় এ বছর রেল খাতে সরকারের দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় হবে।

একই ধরনের কথা জানিয়েছেন যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, একে তো করোনাকালে ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। তার ওপর পেট্রাপোলে যানজটে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে এক মাস ধরে। এতে আমাদের ব্যয় বাড়ত। কিন্তু রেলে পণ্য আসা শুরু হওয়ায় আমদানিকারকরা স্বস্তি পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান বলেন, কনটেইনারের মাধ্যমে আমদানি বাণিজ্য শুরু হওয়ায় আমাদের স্টেকহোল্ডারসহ সব ব্যবসায়ীর বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এতে সময়-খরচ যেমন বাঁচবে, তেমনি যথেষ্ট নিরাপত্তাও রয়েছে। ভারত থেকে রেলযোগে মালামাল এলে আমাদের রেল খাতেও উন্নয়ন হবে। বন্দর একটি চার্জ পাবে। ব্যবসায়ীদের খরচ কম হবে।