একসময় মেড ইন চায়না বলতে কম দামের পণ্য ও সস্তা উৎপাদনের কথাই মনে করা হতো। কিন্তু সে ধারণা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চীনের উৎপাদন খাত শুধু পোশাক, আসবাব বা ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির নির্মাতারা এখন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি), শিল্পযন্ত্র থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরিতেও সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। ইউরোপের যেসব শিল্প দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে, সেখানেও চীনের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। খবর ফরচুন।

ইতালির বিলাসবহুল ব্র্যান্ড গুচি এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। ১০৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার প্রতিষ্ঠানটির একটি নতুন জুতায় ‘মেড ইন চায়না’ লেখা দেখা গেছে। প্রায় ১ হাজার ডলার দামের স্নিকার্সটি তৈরির জন্য চীনের একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছে গুচি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সস্তা শ্রমের জন্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গুণগত মানের কারণে বেছে নেয়া হয়েছে ওই নির্মাতাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, একসময় চীনে তৈরি পণ্যকে কম দাম ও তুলনামূলক কম মানের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। এখন সেই চীনা উৎপাদন সক্ষমতাই ইউরোপের উচ্চমানের পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন সাংহাইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট কের গিবসের ভাষায়, চীন এখন আর শুধু সস্তা পণ্য তৈরির জায়গা নয়।

অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ এ পরিবর্তনকে ‘দ্বিতীয় চায়না শক’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ২০০০-এর দশকের শুরুতে চীনের সস্তা পোশাক, আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্য পশ্চিমা বাজারে ব্যাপকভাবে প্রবেশ করেছিল। সেটিই ছিল প্রথম ধাক্কা। এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। চীন এখন ইভি ও শিল্পযন্ত্রের মতো পণ্য নিয়ে ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে। একই সঙ্গে চীনের কারখানাগুলো উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অর্জন করেছে।

সুইজারল্যান্ডের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক হাওয়ার্ড ইউ বলেন, ‘চীন দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের মতো একই পথে এগোচ্ছে। একসময় এসব দেশের শিল্পও টি-শার্ট ও নামি ব্র্যান্ডের অনুকরণ করা পণ্য তৈরির মধ্যে সীমিত ছিল। পরে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, উন্নত গাড়ি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যে প্রবেশ করে পূর্ব এশিয়ার দেশ দুটি।

চীনের এ দক্ষতা তৈরির পেছনে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোরও ভূমিকা রয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। উদাহরণ হিসেবে ফক্সওয়াগনের কথা বলা যায়। জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮০-এর দশক থেকেই চীনে গাড়ি তৈরি করে আসছে। এর মাধ্যমে চীনের এক প্রজন্মের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পশ্চিমা মান অনুযায়ী পণ্য তৈরির দক্ষতা অর্জন করেছে।

দক্ষতা অর্জনের পর চীনা সরবরাহকারীরা এখন নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করেছে। এতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো একটি নতুন সমস্যার মুখে পড়েছে। এতদিনের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।

তবে চীনে উৎপাদন এখনো ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার তুলনায় সস্তা। জাপানের বাণিজ্য সংস্থার এক জরিপ অনুযায়ী, গত বছর চীনের উৎপাদন খাতের শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ছিল ৬২৯ ডলার। তাইওয়ানে ছিল ১ হাজার ৩৪১ ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২ হাজার ৭৫ ডলার।

চীনের এ পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি। ২০১৯ সাল থেকে চীনের অন্যান্য দেশে রফতানি করা পণ্যের ধরন জার্মানির রফতানির সঙ্গে বেশি মিল রয়েছে। এর মধ্যে আছে কারখানার যন্ত্রপাতি ও গাড়ি। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোর তুলনায় জার্মানির সঙ্গে চীনের রফতানি পণ্যের মিল সবচেয়ে বেশি।

একই সময় চীন জার্মানি থেকে কম পণ্য কিনছে। গত বছর চীনে জার্মানির রফতানি ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে চীন থেকে জার্মানির আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য ঘাটতি এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। শুধু চীনে জার্মান গাড়ির রফতানি কমেছে এক-তৃতীয়াংশ।

ইউরোপের গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক ইউ সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি শিল্পের উদাহরণ দেন। ১৯৭০-এর দশকে জাপানের সস্তা ও নির্ভুল কোয়ার্টজ ঘড়ি সুইস ঘড়ি শিল্পকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছিল। টিকে থাকা ব্র্যান্ডগুলো তখন বাজারের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ে চলে যায়। যান্ত্রিক ঘড়িকে বিলাস পণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে এর জন্য শিল্পটিকে সংকুচিত হতে হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি শিল্পে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজার। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে।

অধ্যাপক ইউ মনে করেন, ইউরোপের কিছু শিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।