রেকর্ড সর্বোচ্চের কাছাকাছি অবস্থান করছে ওয়াল স্ট্রিটের প্রায় সব সূচক। চলতি বছরের প্রায় পুরো সময় বুলিশ প্রবণতায় (ক্রয়চাপ বেড়ে শেয়ার মূল্যবৃদ্ধি) ছিল মার্কিন শেয়ারবাজার। এ প্রবণতা আগামী বছরও অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পুঁজি ও আর্থিক সেবাদাতা নয়টি বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে আসন্ন ২০২৬ সালে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের প্রায় সব সূচকেই প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে দুই অংকের ঘরে।

তবে সার্বিকভাবে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো বড় ধরনের আশঙ্কা রয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর শেয়ারবাজারের অতিনির্ভরতায় চলতি শতকের শুরুর দিকের ডটকম বাবলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন অনেকে।

নয়টি প্রধান বিনিয়োগ ব্যাংকের গড় পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এফটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষদিকে ব্লু-চিপ এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৭ হাজার ৫০০ পয়েন্টের ওপরে পৌঁছবে। এক্ষেত্রে সূচকটির বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে বর্তমান অবস্থানের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশিতে।

পরিসংখ্যান বলছে, আট বছরে সাতবার দুই অংকে বেড়েছে মার্কিন পুঁজিবাজারের সূচকগুলো। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। সূচকগুলোর প্রবৃদ্ধির হার দুই অংকের ঘরে পৌঁছলেও তা চলতি বছর ও বিগত এক দশকের গড়ের তুলনায় কম হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো।

গত এপ্রিলের পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রেখে একের পর এক রেকর্ড গড়েছে মার্কিন পুঁজিবাজার। এক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে উল্লম্ফন। যদিও এক পর্যায়ে এসব কোম্পানির সম্পদ ও সম্পদমানে অতিরঞ্জন ও অতিমূল্যায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কা থেকে গত মাসে বড় ধরনের পতনের দেখা পেয়েছে ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার সূচকগুলো। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করছাড় এবং ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) আরেক দফায় সুদহার কমানোর সম্ভাবনা বাড়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে মার্কিন পুঁজিবাজার।

মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুসারে, আগামী বছরের শেষদিকে এসঅ্যান্ডপি সূচক বেড়ে হতে পারে ৭ হাজার ৮০০ পয়েন্ট। এ বিষয়ে আর্থিক খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটির এক নোটে বলা হয়, ‘২০২৬ সালে ওয়াল স্ট্রিটে হয়তো কিছু ওঠানামা থাকবে। কিন্তু বাজারের বুলিশ প্রবণতা এখনো অক্ষত রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।’

ট্রাম্পের ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিলের ১২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের করছাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা বলছেন, একাধিক বিষয় বাজারের পারফরম্যান্সকে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে এআই কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি শিথিল মুদ্রা ও আর্থিক নীতি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে উদার নীতির প্রয়োগ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

এপ্রিলে ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে ট্যারিফ ব্লিৎজে’ শেয়ারবাজারে বিক্রয়চাপ বেড়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সূচকের পতন প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। এরপর বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বেড়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় পুনরুজ্জীবিত হয় বাজার। এপ্রিলের পর চিপ নির্মাণ খাতের মার্কিন জায়ান্ট এনভিডিয়ার শেয়ারদর বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এর মধ্য দিয়ে এনভিডিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম কোম্পানি। গত অক্টোবরে বিশ্বের প্রথম ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের কোম্পানি হিসেবে রেকর্ড গড়ে এনভিডিয়া।

সপ্তাহ দেড়েক ধরে একাধিক প্রভাবক মার্কিন শেয়ারবাজার সূচকগুলোয় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণ হয়ে উঠেছে। ফেডের কর্মকর্তাদের একের পর এক মন্তব্যের রেশ ধরে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, আগামী বছরের শেষদিকে তিন-চার দফায় ২৫ বেসিস পয়েন্ট হারে কমতে পারে সুদহার।

ডয়চে ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৮ হাজার পয়েন্টে পৌঁছবে। এ সূচকে বৃদ্ধির হার হতে পারে চলতি বছরের প্রায় সমান। বৃহৎ ব্যাংকগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস। ব্যাংকটির ইউএস ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট বিভাগের প্রধান বিনকি চাডহা আশা করছেন, আগামী বছরের শুরুতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে শক্তিশালী করপোরেট আয়ের তথ্য বাজারে রিটার্ন বাড়াবে এবং শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্স প্রযুক্তি খাতের বাইরেও সম্প্রসারণ হবে।

ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকরা আশাবাদের পাশাপাশি পূর্বাভাসে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে এখনো এআই উন্নয়ন ও ডাটা সেন্টার নির্মাণে করা ব্যয়ের কোনো প্রভাব উঠে আসেনি।

প্রাক্কলন অনুসারে, ওয়াল স্ট্রিটের তুলনায় কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য বাজারেও ২০২৬ সালে উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। স্টকস ইউরোপ ৬০০ সূচক বর্তমানে অবস্থান থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়বে। জাপানে টোকিও স্টক মার্কেট প্রাইস ইনডেক্স (টপিক্স) বাড়তে পারে প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

নিউইয়র্কে শুক্রবার শেয়ারবাজার সূচকগুলো সপ্তাহ শেষ করেছে ঊর্ধ্বমুখিতায়। দিনশেষে ওয়াল স্ট্রিট সূচকগুলোর অবস্থান ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চের কাছাকাছিতে। এদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। এদিন এখানকার অন্য দুই প্রধান সূচক ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ও নাসডাক কম্পোজিট বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক ২ ও দশমিক ৩ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ যদি আবার রেকর্ড শীর্ষে পৌঁছায়, তবে এটি হবে মার্কিন শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উদ্বেগের চক্র অতিক্রমের বড় উদাহরণ। এ চক্রের মধ্যে রয়েছে সুদহার হ্রাস, এআই প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির দামে তীব্র পতনজনিত উদ্বেগ।