দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোল। স্বাভাবিকভাবে এ স্থলবন্দর দিয়ে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আয়ও বেশি হয়। তবে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে যশোর সীমান্তের এ স্থলবন্দরটি। বেনাপোল দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হচ্ছে, দেশের বাজারে আমদানি হচ্ছে তার চেয়ে চার গুণের বেশি পণ্য। এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পাঁচ অর্থবছরে ভারত থেকে এ স্থলবন্দর আমদানি হয়েছে ৮৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮১১ টন পণ্য। আর দেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ১৮ লাখ ৭২ হাজার ২১০ টন পণ্য।
স্থলবন্দর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে দেশের বাজারে আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪ টন পণ্য। এর বিপরীতে এ স্থলবন্দর দিয়ে দেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৫০ টন পণ্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের সম্মিলিত পরিমাণ ২১ লাখ ৮১ হাজার ১২৩ টন। রফতানি হয়েছে ৪ লাখ ১ হাজার ১১৭ টন পণ্য।
একই চিত্র দেখা গেছে আগেও। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভারত থেকে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৫৯ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৬৩ টন পণ্য। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩২৯ টন। রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৮১ টন।
আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি ও রফতানি হওয়া পণ্যের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৮ টন ও ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৩৯ টন। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরেও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ১৭ লাখ ৫ হাজার ১১৩ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর বিপরীতে দেশ থেকে রফতানি হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৫ টন পণ্য।
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশের বাজারে আমদানি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে—শিল্প কারখানায় ব্যবহার হওয়া কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, মেশিনারি যন্ত্রাংশ, সুতা ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ও নিত্যপণ্য। আর এ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের বাজারে রফতানি হওয়া পণ্যের তালিকায় রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ, তৈরি পোশাক, বসুন্ধরা টিস্যু প্রভৃতি।
স্থলবন্দর কার্যালয় সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রতি অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়। এর বিপরীতে এ স্থলবন্দর দিয়ে রফতানি হয় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য। আমদানি পণ্য থেকে সরকারের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। তবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্য ৬ হাজার ২৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ার বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের স্থলপথে আমদানি-রফতানির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেনাপোল দিয়ে পরিচালিত হয়। তবে কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় অনেকে এ পথে বাণিজ্যে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যপূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়ে যাচ্ছে। স্থলবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সরকারের রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করা যেত।
অবকাঠামো ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, স্থলবন্দরের ভেতরে জায়গা স্বল্পতার কারণে যত্রতত্র পণ্য রাখতে হয়। এতে অনেক সময় রোদ-বৃষ্টিতে পণ্যের গুণাগুণ নষ্ট হয়। চুরির ভয় থাকে। এছাড়া স্থলবন্দরে ক্রেন ও ফর্কক্লিপের সংকট বহুদিনের।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপালের মধ্যকার চার দেশের বাণিজ্য কার্যক্রম বিবিআইএন চালু হলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রফতানি বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন এখানকার সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন। বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আজও বিবিআইএনের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে এক অর্থবছরে ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
বেনাপোল কাস্টমসের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের বৈধ সুবিধা বাড়ানোর পক্ষে। এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতে চিঠি দেয়া হয়েছে।










