রুটি ও মাখনের দীর্ঘস্থায়ী ঘ্রাণ, কেবলই ভেজে তোলা টাটকা সমুচা এবং আগুন গরম ক্রিমি ইরানি চা—এই দৃশ্যগুলো চোখে পড়বে ভারতে অবস্থিত পারস্য ধাঁচের রেস্তোরাঁগুলোতে। ইরানি ক্যাফে নামে সকলের কাছে পরিচিত এই আইকনিক রেস্তোরাঁগুলোর রয়েছে কিছু নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য। মার্বেল পাথরের টেবিল, দেয়ালে পুরনো ধাঁচের ঘড়ি, ছককাটা মেঝে এবং স্বতন্ত্র খাদ্যতালিকা নিয়ে প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে এসব ইরানি ক্যাফে।
ভারত ছাড়িয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে ইরানি ক্যাফেগুলোর প্রভাব। লন্ডনের অন্যতম জনপ্রিয় চেইন রেস্তোরাঁ ডিশুমও ইরানী ক্যাফে থেকে অনেকটাই অনুপ্রাণিত।
১৮ এবং ১৯ শতকে মুম্বাই এবং পুনের মতো শহরে প্রথম দেখা যায় এ ধরনের ক্যাফে। তখন ইরান থেকে পারস্যের অভিবাসীরা ভারত এসেছিলেন। ভারতের দক্ষিণের শহর হায়দরাবাদে কয়েক দশক ধরে স্থানীয় সংস্কৃতির একটি অন্তর্নিহিত অংশ হয়ে ওঠেছে এই ক্যাফেগুলো।
সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সত্ত্বেও এ শহরের ক্যাফেগুলো ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন। পুনে এবং মুম্বাইয়ের মতো হায়দরাবাদেও দ্রব্যের ক্রমবর্ধমান দাম, ফাস্ট ফুড কালচার এবং ভোক্তাদের রুচির পরিবর্তনের কারণে ইরানি ক্যাফেগুলোর সংখ্যা অনেকটাই কমেছে বলে জানান রেস্তোরাঁগুলোর মালিকরা।
হায়দ্রাবাদে আজও মুম্বাইয়ের পরেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ইরানি ক্যাফে আছে। ইরানে দণ্ড বা দুর্ভিক্ষ এড়াতে হায়দরাবাদসহ ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে এসেছিল ইরানীয়রা। কেউ কেউ এসেছিলেন ভালো চাকরি ও ব্যবসার খোঁজে।
ইরানীয়রা যে সময়ে ভারতে এসেছিল তা মিলে যায় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে। ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে পানীয় হিসেবে চায়ের প্রচলন ঘটায়। আর ইরানীয়রা চায়ে নিয়ে আসে নিজস্ব ঢং। ক্রিম এবং কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে চায়ের এই নতুন রসায়ন ভারতে নিয়ে আসে ইরানীয় রসনা।
হায়দ্রাবাদ ভিত্তিক ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ সফিউল্লাহ বলেন, প্রথমে চা খানা নামে বিক্রি করা হত এবং শুধুমাত্র মুসলমানরা তা পান করত। কিন্তু শীঘ্রই, অন্যান্য ধর্মের মানুষও এর স্বতন্ত্র স্বাদ গ্রহণ করে।
২০ শতকের মধ্যে ইরানি ক্যাফেগুলো পৌঁছে যায় হায়দরাবাদের প্রতিটি কোণে। এক কাপ চা নিয়ে কফি শপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত মানুষ। অল্প কিছু অর্থের বিনিময়ে পছন্দের গান শোনার ব্যবস্থারও ছিল। ইতিহাসবিদ পারভাস্তু লোকেশ্বর বলেছেন, হায়দরাবাদের ইরানি ক্যাফেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ক্যাফেগুলোর নামের কোনো ধর্মীয় অর্থ ছিল না। সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল।
তবে এখন ক্রমেই কমে আসছে ক্যাফেগুলোর সংখ্যা। বিখ্যাত ইরানি ক্যাফে দ্য গ্র্যান্ড হোটেলের মালিক জলিল ফারুক রুজ বলেছেন, দুই দশক আগেও হায়দরাবাদে ইরানি ক্যাফে ছিল সাড়ে চারশ’র বেশি। আর এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র ১২৫টি। দিনে সাধারণত ৮ থেকে ৯ হাজার কাপ চা বানানো হত। এখন তার রেস্তোরাঁয় দিনে মাত্র ৪ হাজার কাপ চা বিক্রি হয়।
এর কারণ হিসেবে হায়দরাবাদের বিবর্তনকে দেখিয়েছেন এই রেস্তোরাঁ মালিক। আইটি সেক্টরে ব্যাপক উন্নতির ফলে ৯০-এর দশকে ছোট শহর হায়দরাবাদের চেহারা এখন আমূল পাল্টে গেছে। ভারতের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও ফাস্ট ফুড চেইন শপগুলো জায়গা নিয়েছে। সেসব আধুনিক রেস্তোরাঁয় বসার জায়গা থেকে শুরু করে খাবারের তালিকায় এসেছে নানা বৈচিত্র।
জলিল ফারুক রুজ জানান, অধিকাংশ ইরানি ক্যাফের জন্যই প্রশস্ত জায়গা দরকার আর জায়গা ভাড়া নিয়েই ব্যবসা করে আসছেন তারা। কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ভাড়ার পরিমাণ। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় গুড়ো দুধ এবং চা পাতার দাম ৫ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ৩ গুণ। তাই অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে অন্য কিছু করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কয়েকজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী স্রোতের প্রতিকূলে তাদের ক্যাফেগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন। তেমনই একজন হলেন রেড রোজ রেস্তোরাঁ পরিচালনা করা সৈয়দ মোহাম্মদ রাজাক। তার দাদা তেহরান থেকে চলে এসে ১৯৭০ সালে সিটি লাইট হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে রাজাকের বাবা চালু করেন রেড রোজ রেস্টুরেন্ট।
পেশায় প্রকৌশলী এবং গ্রাফিক ডিজাইনার রাজাক স্বীকার করেছেন যে, শুধু চা এবং বিস্কুট বিক্রি করা সহজ এবং লাভজনক কোনোটিই নয়। তিনি এখন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে মেন্যুতে এনেছেন নতুন খাবার। ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং অনলাইনে প্রচারের জন্য তিনি ব্যবহার করছেন তার গ্রাফিক ডিজাইনিং দক্ষতা। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারের উত্তরাধিকার চালিয়ে যেতে চাই।
শুধু মালিক নয়, এমন গ্রাহকরাও আছেন যাদের মধ্যে অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ক্যাফেগুলোতে নিয়মিত আসছেন। তেমন একজন হলেন ইয়ানি। তিনি বলেন, ইরানি চা আমার জীবনের অংশ। বাইরে গেলেই এই চা পান করি। এখনো গ্র্যান্ড হোটেলে নিয়মিত যাওয়া ইয়ানি বলেন, আজও এর মতো কিছু পাইনি।










