দেশে প্রতি বছর শীত মৌসুমে চিনির চাহিদা এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। এ সময় উৎপাদন মৌসুম চলায় সরবরাহ বেড়ে বাজারও স্থিতিশীলতায় ফেরে। কিন্তু চলতি বছর উল্টো আচরণ করছে চিনির বাজার। অব্যাহত বাড়ছে ভোগ্যপণ্যটির দাম। বাজার তথ্য বলছে, শুল্ক কমানোর পরও গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ৫০০ টাকা। সরকারি পর্যায়ে চিনির দাম বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দামে স্থিতিশীলতা ফিরছে না বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন সরকারি মিলে উৎপাদিত চিনির দাম কেজিপ্রতি এক লাফে ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১২৫ টাকা নির্ধারণ করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুল্ক কমানোর পর সরকারি চিনির দাম বাড়ানোর কারণে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারে দাম না কমে উল্টো বেড়েছে। এর সঙ্গে চলমান ডলার সংকট ও ঋণপত্র (এলসি) খুলতে বিড়ম্বনার কারণেও চিনির বাজার অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা।

এক মাস আগেও পাইকারি পর্যায়ে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম ছিল ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। দাম কমানোর উদ্দেশ্যে চিনির কাস্টমস শুল্ক ৩ হাজার টাকা থেকে টনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। শুল্ক কমানোর পর দেশের বাজারে চিনির দাম কমে আসার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা ফলেনি। বরং শুল্ক কমানোর ঘোষণা আসার পর টানা কয়েক দিন ধরে চিনির দাম বেড়েছে। সরকারি মিলের চিনির দাম কেজিপ্রতি ১২৫ টাকা করার পর বেসরকারি মিলের চিনির দাম বেড়ে ১৩৫ টাকায় ওঠে। আর খুচরা পর্যায়ে পণ্যটির দাম ওঠে ১৪০-১৪৫ টাকায়।

জানতে চাইলে দেশের অন্যতম অপরিশোধিত চিনি আমদানি ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার চিনি আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু ডলারের দাম যে হারে বেড়েছে এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে দেশেও দাম বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা আমদানিতে কেজিপ্রতি ৪৩ টাকা শুল্ক পরিশোধ করি। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, শুল্ক কমছে মাত্র দেড় টাকা।’ গত সপ্তাহে যে হারে ডলারের দাম বেড়েছে তাতে দামের অস্থিরতা কমানো কিংবা লোকসান এড়ানোর ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের কিছুই করার থাকছে না বলে দাবি করেন তিনি।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুল্ক কমানোর আগে পাইকারি পর্যায়ে চিনির মণপ্রতি দাম ছিল ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। শুল্ক কমানোর পর দাম না কমে উল্টো বেড়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই দাম বেড়ে মণপ্রতি ৫ হাজার ৭০০ টাকায় উঠে যায়। বর্তমানে কিছুটা কমে ৫ হাজার টাকায় নামলেও ডলার সংকটসহ সরবরাহ সংকটে চিনির বাজারে অস্থিরতা কাটেনি। প্রতি সপ্তাহের ডলারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় নিত্যপণ্যটির বাজার আরো অস্থির হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, বর্তমানে সারা দেশের প্রায় চার হাজার ডিলার প্রতিনিধি রয়েছে। এসব ডিলারদের মাত্র ৫০ কেজি করে চিনি বরাদ্দ দিচ্ছে বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন। তবে নতুন মাড়াই মৌসুম শুরু হওয়ায় চিনি সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা আনার দাবি জানিয়েছেন পণ্যটির ডিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে চিনির সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে গ্রীষ্মকালীন মৌসুম ও রোজার মাসে। শীত মৌসুমে শরবত ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের ব্যবহার কম থাকায় চাহিদাও থাকে কম। এ কারণে শীতের কয়েক মাস চাহিদা কমায় দামও কমে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমদানি সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চিনি উৎপাদন মিলগুলোয় উৎপাদন কমে যাওয়া, ১৫টি মিলের মধ্যে ছয়টি মিলের উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এসব কারণে সরকারি ডিলারদের চিনি সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন।