রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই একে অন্যের কৃষিপণ্য রফতানি কেন্দ্র এবং সমুদ্রগামী বাণিজ্য জাহাজে আক্রমণ জোরদার করায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথটি এখন গভীর উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। খবর রয়টার্স।

মধ্যপ্রাচ্যের লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে এমনিতেই বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে রয়েছে। এর মধ্যে কৃষ্ণ সাগরের এ নতুন সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব পণ্যবাজারে বাড়তি অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইউক্রেনের অবকাঠামো মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, কেবল জুলাইয়েই সমুদ্র ও বন্দর এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ৫৭টি হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া বন্দর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হয়েছে ৬৭টি হামলা। অথচ আগের ২০২৫ সালে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছিল মাত্র ১৪টি।

কৃষ্ণ সাগর মূলত রাশিয়া, ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্কের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। যুদ্ধ শুরুর চার বছর পরও কৃষিপণ্যই ইউক্রেনের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। দেশটির মোট কৃষিপণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি রফতানি হয় দক্ষিণাঞ্চলীয় ওডেসা বন্দরের মাধ্যমে। বর্তমানে রাশিয়া ওডেসার আশপাশের অবকাঠামোয় আক্রমণ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালানোয় পথটি খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনের কৃষিমন্ত্রী তারাশ ভিসোৎস্কি জানিয়েছেন, কৃষ্ণ সাগরের বিকল্প হিসেবে স্থল ও নদীপথ ব্যবহারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিকল্প রুটগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত হতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত সময় লাগবে। কিন্তু এগুলো দিয়ে স্বাভাবিক চাহিদার মাত্র অর্ধেক পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে। এছাড়া আজভ সাগরে চলাচল সীমিত করায় রাশিয়ার তামান, নভোরোসিস্ক ও তুআপসে বন্দরে শস্য পাঠাতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।

খাদ্যশস্যের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনীয় হামলার পর কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম (সিপিসি) টার্মিনালে জ্বালানি তেল খালাস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, কাজাখস্তান মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই সিপিসি পাইপলাইনের মাধ্যমে করে। ফলে এ রুটে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রুশ শিপিং কোম্পানি এফইএসসিও এ রুটে নতুন পণ্য পরিবহনের অর্ডার নেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় কৃষ্ণ সাগরে পণ্য পরিবহনের খরচও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যানুযায়ী, কৃষ্ণ সাগরের বন্দরগুলোয় ভিড়তে যুদ্ধ ঝুঁকি বীমা (ওয়ার ইন্স্যুরেন্স) ফি দ্বিগুণ হয়ে জাহাজের মোট মূল্যের ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া ২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে। শিপিং সংস্থা বিআইএমসিওয়ের প্রধান বিশ্লেষক নীলস রাসমুসেন সতর্ক করেছেন, সরবরাহ এভাবে ব্যাহত হতে থাকলে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন অন্তত ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের কর্মকর্তা কায়োকো গোতো বলেছেন, আন্তর্জাতিক কৃষিবাজারে এ সংঘাতের ক্ষতিকর প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক স্টিফেন কটন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ নিরপরাধ নাবিকদের জীবন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। সমুদ্রপথে নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা অ্যামব্রে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।