বহুমুখী প্রতিবন্ধকতায় লম্বা সময় ধরে সংকটে চিনির বৈশ্বিক সরবরাহ। এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ব্রাজিলের বন্দরগুলোয় জাহাজ ও কনটেইনার জট। ফলে বিদ্যমান সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।

ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ চিনি উৎপাদক ও রফতানিকারক। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাও পাওলো প্রদেশের সান্তোস বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি চিনি রফতানি হয়। এ বন্দরে চিনিসহ অন্যান্য পণ্য লোডিংয়ে অস্বাভাবিক দেরি হচ্ছে। সাধারণত জেটিতে জাহাজ ভেড়া থেকে শুরু করে চিনি লোড হওয়া পর্যন্ত এক সপ্তাহ লাগে। কিন্তু বর্তমানে এক্ষেত্রে সময় লাগছে প্রায় ৩৫ দিন। ফলে দেশটির রফতানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সুকডেনের চিনি বাণিজ্য বিভাগের সহাকারী প্রধান দিমিত্রি ভারসানো বলেন, ‘‌নভেম্বরজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়লে লোড-আনলোড প্রক্রিয়া আরো ধীর হয়ে পড়তে পারে।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে চিনি। এমন পরিস্থিতিতে ব্রাজিলের রফতানি ব্যাহত হলে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি দাম আরো বেড়ে যেতে পারে।

দিমিত্রি ভারসানো বলেন, ‘‌চলতি মৌসুমে ব্রাজিলে রেকর্ড পরিমাণ চিনি উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভারত, থাইল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা পণ্যটির বৈশ্বিক সরবরাহকে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। 

ইন্টারন্যাশনাল সুগার অর্গানাইজেশন (আইএসও) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩-২৪ মৌসুমে চিনির বৈশ্বিক উৎপাদন ১ দশমিক ২১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে এ মৌসুম শুরু হয়েছে। এ মৌসুমে চিনির বৈশ্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২১ লাখ ১৮ হাজার টন। 

সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ সময় ভোগ্যপণ্যটির বৈশ্বিক উৎপাদন দাঁড়াবে ১৭ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার টনে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার টন। এদিকে পণ্যটির ব্যবহার ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৬০ হাজার টনে উন্নীত হতে পারে। 

বিশ্লেষকরা জানান, উৎপাদনের তুলনায় ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজার উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতির দিকে মোড় নেবে। এগ্রিমান্ডির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও উপল শাহ জানান, বৈশ্বিক উৎপাদন পরিস্থিতি বেশকিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উৎপাদনে বড় প্রভাব রাখবে। 

তিনি আরো জানান, এ বছর ব্রাজিলে রেকর্ড আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর পরও চিনি উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। কারণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে মিলগুলো চিনির পরিবর্তে ইথানল উৎপাদন বাড়াতে পারে। আগামী কয়েক মাস চিনি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিনি উৎপাদক। কোটার ভিত্তিতে দেশটি চিনি রফতানি করে। আগামী মৌসুমে ভারত চিনি রফতানি না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ খবর প্রকাশের পর চিনি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন উপল শাহ। তিনি বলেন, ‘‌আগামী বছরের শুরুতে পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।’ 

আইএসওর নির্বাহী পরিচালক জশ ওরিভ বলেন, ‘‌নিউইয়র্কের ইন্টারকন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত চিনির দাম ১২ বছরের সর্বোচ্চে অবস্থান করছে। প্রতি পাউন্ড লেনদেন হচ্ছে ২৭ দশমিক ৪৪ সেন্টে।’ 

বৈশ্বিক উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখবে ভারতের উৎপাদন পরিস্থিতি। ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশটিতে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩ কোটি ১৭ লাখ টনে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, উৎপাদনের পরিমাণ তিন কোটি টনে নামতে পারে। 

ভারতে মৌসুমের শুরুতে চিনির মজুদ দাঁড়াতে পারে ৫৭ লাখ টনে। মোট চিনি সরবরাহের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ টন। স্থানীয় বাজারে ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২ কোটি ৮১ লাখ টনে। মোট চাহিদার পরিমাণ দাঁড়াবে ২ কোটি ৯১ লাখ টনে। 

দেশটির বন্দরগুলোয় জট সৃষ্টি হলে তা স্বাভাবিকভাবেই ভোগ্যপণ্যটির বৈশ্বিক সরবরাহ ও দামকে প্রভাবিত করে।