দেশের বিদ্যুৎ খাতে ইনসুলেটরের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। তবে উৎপাদন হয় দুই হাজার টনেরও কম। ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে চাহিদার ১০ শতাংশও পূরণ হয় না উৎপাদিত ইনসুলেটরের মাধ্যমে। বাকি প্রায় ১৮ হাজার টন বা ৯০ শতাংশ চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হয়।

ইনসুলেটর বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় এমন একটি উপাদান, যা খুঁটিকে বিদ্যুৎ অপরিবাহী রেখে বিদ্যুৎ পরিবহনে সহায়তা করে। এছাড়া বুশিং ট্রান্সফরমার তৈরির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি। দেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ইনসুলেটর উৎপাদন করে। এর মধ্যে একটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফ)। অন্যটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিরান ইনসুলেটর ফ্যাক্টরি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দুটি মাত্র দশমিক ৪ থেকে ৩৩ কিলোভোল্টের ইনসুলেটর উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু দেশে ৪০০-৫০০ কিলোভোল্ট ইনসুলেটরের চাহিদাও রয়েছে।

বিআইএসএফ ১৯৮১ সালে ইনসুলেটর উৎপাদন শুরু করে। কারখানাটি প্রতিষ্ঠার পর এর মেয়াদ ছিল পরবর্তী ২২ বছর, অর্থাৎ ২০০১ সাল পর্যন্ত। অথচ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ২১ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ইনসুলেটর উৎপাদন করে যাচ্ছে। মাত্র ৩৩ কিলোভোল্টের উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। এর চেয়ে বেশি ভোল্টেজের ইনসুলেটর উৎপাদন করতে কারখানার সেটআপ পরিবর্তন করতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, এ কারখানাকে অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় আনা দরকার। শত বছরের পুরনো প্রযুক্তি পরিবর্তন করে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠার সময় বিআইএসএফের বছরে ২ হাজার ৪০০ টন ইনসুলেটরের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জনবল সংকট, পুরোনো যন্ত্রপাতিসহ নানা সংকটে সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে।

এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিরান ইনসুলেটর ২০০৪ সাল থেকে উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা দেড় হাজার টন। তবে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসস্বল্পতা ও ক্রয়াদেশ পাওয়ার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় এক হাজার টন ইনসুলেটর উৎপাদন করে বলে জানান দিরান গ্রুপের পরিচালক (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী সরদার এএইচএম রেদোয়ান।

বিআইএসএফের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৯৬৯ দশমিক ১৬ টন ইনসুলেটর বিক্রি করেছে, যার বিক্রয়মূল্য ২১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর এখান থেকে সরকারকে ভ্যাট দিয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ইনসুলেটর বিক্রি করেছে ৮১৭ দশমিক ৭৩ টন, যার বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ১৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এখান থেকে সরকারকে ভ্যাট দিয়েছে ২ কোটি টাকা।

বিআইএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল ফয়েজ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বিআইএসএফের যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হলে বিআইএসএফএল দেশের স্যানিটারি এবং ইনসুলেটরের বাজার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যে পরিমাণ ইনসুলেটর উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁচামাল চীন ও ভারত থেকে আনতে হচ্ছে। ফলে ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করলে সেটির দাম পড়ে যাচ্ছে বেশি। এ কারণে দেশের বাজারে বিক্রিও কম। এক্ষেত্রে দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় আমদানীকৃত ইনসুলেটরের চাহিদাই বেশি।

তবে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন। বিডার সহযোগিতায় সিলেটের ছাতকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ইনসুলেটর তৈরির প্লান্ট স্থাপন করবে নিটল-নিলয় গ্রুপ।

গ্রুপটির চেয়ারম্যান আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, আমরা মূলত রফতানি করার লক্ষ্য নিয়েই কারখানা স্থাপন করছি। আমাদের কারখানা থেকে রফতানির চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সাইজের ইনসুলেটর উৎপাদন করা হবে। দেশের বাজারে আমরা কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চাই না। তবে সরকার চাইলে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলেটর সরবরাহ করব। এখান থেকে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ইনসুলেটর রফতানি করা হবে।

বেসরকারি খাতে কেন আর কোনো ইনসুলেটর কারখানা তৈরি হয়নি জানতে চাইলে দিরান ইনসুলেটর ফ্যাক্টরি লিমিটেডের পরিচালক (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী সরদার এএইচএম রেদোয়ান বলেন, ইনসুলেটর অন্যান্য সিরামিক পণ্যের মতো নয়। তৈরির পরই ইনসুলেটর বিক্রি করা যায় না। এটা তৈরির পর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার ভোল্টের টেস্ট করা হয়, বিদ্যুৎ অপরিবাহী কিনা তা দেখার জন্য। টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই কেবল তা বাজারজাত করা যায়। আর এজন্য অনেকেই এ ঝামেলার মধ্যে যেতে চায় না। তাই বেসরকারি পর্যায়ে এর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বাড়েনি।