রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে গতকাল এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ইআরএফ। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বাস্তবভিত্তিক ও দেশ উপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যেই অর্থনীতিতে দৃশ্যমান উন্নতি অর্জন সম্ভব। ২০২৬ অথবা ২০২৯ সাল হোক, এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ তথা সবার জন্য অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার।’ বর্তমানে অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক নীতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘সংকট মোকাবেলায় সৃজনশীল ও দেশোপযোগী সংস্কার জরুরি, যা কোনো আন্তর্জাতিক ফরম্যাট বা কনসালট্যান্সি মডেল দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।’ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মানুষের রেজিলিয়েন্স (সহনশীলতা) ও সৃজনশীলতাকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি দাবি করে অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশ এবং সামাজিক সুরক্ষায় ৩ শতাংশ ব্যয় নিশ্চিত করা গেলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে সহায়ক হবে। বর্তমানে এসব খাতে সম্মিলিত ব্যয় ৫ শতাংশেরও কম।’
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা প্রসঙ্গ তুলে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত সমস্যা সমাধান না করে শুধু পুনঃতফসিলের মাধ্যমে তা কম দেখানো হলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাবে।’
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলেও ‘লোয়ার মিডল ইনকাম ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেশের রফতানি খাত বর্তমানে বড় সংকটে রয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা ৮-১০ মাস রফতানি কমেছে। সামনে আরো চার-ছয় মাস এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষত মার্কিন-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এ সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। পোশাক শিল্প দেশের কর্মসংস্থানের প্রধান খাত, সেখানেও প্রতিনিয়ত কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটছে, ফলে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে।’
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আইএমএফ, আইএলও ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিভিন্ন শর্ত আরোপ করলেও বিদেশী ক্রেতারা পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিচ্ছে না।’
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ টেকসই করতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ‘একটি নীতির ভিত্তিতে শিল্পােদ্যোক্তারা বিনিয়োগ শুরু করলেও পরে তা পরিবর্তনের কারণে সেই শিল্প দুর্বল হয়ে পড়ে।’ তাই অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল নীতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি আরো বলেন, ‘সরকার ঘোষিত এক কোটি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুধু পোশাক বা বস্ত্র খাতের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করতে হবে, কারণ একক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
সেমিনারে ফুটওয়্যার লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব মো. রফিকুল ইসলাম ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘সুদের হার যৌক্তিক ও স্থিতিশীল রাখতে হবে, যাতে এসএমই ও রফতানিমুখী শিল্প সহজে অর্থায়ন পায়। ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত হলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।’
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।










