অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথাযথভাবে যাচাই না করেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পার্কে অবকাঠামো গড়ে উঠলেও উদ্যোক্তা বিকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো প্রয়োজনীয় কার্যকর ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠেনি। ফলে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত এসব অবকাঠামো প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারছে না বলে মনে করছেন সাবেক নীতিনির্ধারক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা। গতকাল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘হাই-টেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এ বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম রকনুজ্জামান; ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারহানা এ রহমান; ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফেল কবির; যশোর হাই-টেক পার্কে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অংশ ইন্টারন্যাশনালের এমডি মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম এবং হাই-টেক পার্ক রাজশাহীর নেট্রো সিস্টেমস লিমিটেড ও টেলজেনের সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির।

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘হাই-টেক পার্কের লক্ষ্য ও মিশন নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা সেখানে শুধু জায়গা ভাড়া নেবেন, নাকি তাদের ব্যবসা গড়ে তুলতে ও বড় হতে সহায়তা করা হবে—সেটি স্পষ্ট করতে হবে। হাই-টেকের ধারণাও শুধু সফটওয়্যারে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ও ব্যবসার বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। হাই-টেক পার্কের সাফল্যের সূচকে সফল কোম্পানি তৈরি ও তাদের বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক, প্রশিক্ষণদাতা ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প ও একাডেমিয়ার সংযোগ দুর্বলতা কাটাতে হবে। ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে না।’ এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন হোসেন জিল্লুর রহমান।

ইউওয়াই সিস্টেমসের চেয়ারপারসন ও সিইও ফারহানা এ রহমান বলেন, ‘অসংখ্য পার্ক তৈরির পরিবর্তে একটি বা কয়েকটি পার্ককে দৃশ্যমান ও কার্যকর করার দিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।’ একটি জায়গায় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা গেলে শিল্পের ব্র্যান্ডিং ও বাজারে আস্থা বাড়বে বলেও দাবি করেন তিনি।

এনএসইউর অধ্যাপক ড. এম রকনুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক হাই-টেক পার্কে অবকাঠামো, যোগাযোগ, ইউটিলিটি, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং নীতি-প্রণোদনা একসঙ্গে কাজ করবে—এমন একটি প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; গবেষণা, দক্ষতা, শিল্প ও নীতির মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।’

ডিএনএস সফটওয়্যারের এমডি রফেল কবির মনে করেন, সঠিক নীতিসহায়তা থাকলে হাই-টেক পার্ক দেশের প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারত। তবে বর্তমানে নির্মিত বিপুলসংখ্যক অবকাঠামো কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অংশ ইন্টারন্যাশনালের এমডি মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাই-টেক পার্কের সাফল্য শুধু কয়টি প্রতিষ্ঠান সেখানে জায়গা নিয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। একটি প্রতিষ্ঠান ১০ জন কর্মী নিয়ে শুরু করে ১০০ বা এক হাজার কর্মী পর্যন্ত যেতে পারছে কিনা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এবং গবেষণা ও উন্নয়নে এগোচ্ছে কিনা—এসব দিয়ে সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে।’ এছাড়া পার্ক কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী ধাপে নিতে কী ধরনের সহায়তা করেছে, সেটিও বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

নেট্রো সিস্টেমস ও টেলজেনের সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির বলেন, ‘স্টার্টআপ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ ও সরকারি-বেসরকারি সহায়তার সুযোগ বাড়ানো দরকার।’