ভালো কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া ৪০-৫০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী বড় কোম্পানির জন্য আইপিও ছাড়াই সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হচ্ছে। একবার নিরীক্ষার মাধ্যমে কোম্পানির প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই হয়ে গেলে একই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন না করার ব্যবস্থাও করা হবে। এতে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া আরো দ্রুত ও সহজ হব। গতকাল চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স হলে দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) ও আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেট গ্রোথ ডায়ালগ: পাথওয়ে টু লিস্টিং’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
তিনি বলেন, ‘কমিশনের মূল লক্ষ্য ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা। অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। অথচ ভালো কোম্পানি ছাড়া পুঁজিবাজারের উন্নতি সম্ভব নয়। বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলো যাতে সহজে তালিকাভুক্ত হয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, সেজন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগের কথা তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার ৫০০ কোটি টাকা, তারা নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। এক্ষেত্রে আইপিওর প্রয়োজন হবে না। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানির জন্য নানা ধরনের সুবিধা তৈরি হয়। এর মধ্যে করপোরেট করহারে ছাড়, সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ এবং কৌশলগত বা বৈদেশিক বিনিয়োগ গ্রহণের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা বা পরিচালক চাইলে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সহজে বের হয়ে যেতে পারেন। ভবিষ্যতে রাইট শেয়ার ও পুনরায় গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ এবং বিদেশী কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনার সুযোগও থাকে।’
দেশের পুঁজিবাজারের লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলক কম উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, ‘গত সপ্তাহের হিসাবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ মোট বাজার মূলধনের মাত্র দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সময়ে পাকিস্তানে এ হার দশমিক ১৯ শতাংশ, থাইল্যান্ডে দশমিক ২৩, ভারতে দশমিক ২৬ ও ভিয়েতনামে দশমিক ২১ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে দেশের দৈনিক লেনদেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উঠেছিল। বর্তমানে লেনদেন ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উঠলে তা বাজার মূলধনের প্রায় দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়াবে।’
বিএসইসি চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘বর্তমানে এনবিআরের ক্লিয়ারেন্সের কারণে বিদেশী শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে কমিশন পরিবর্তন এনে এনবিআরের ক্লিয়ারেন্স সাপেক্ষে লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।’
আলোচনা সভায় চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, ‘পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে হলে বিএসইসি ও এর কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যের মতো না হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। ন্যায্য ও সমান আচরণ নিশ্চিত না হলে বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনা কঠিন হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পিএসপি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ ও এমজিআইসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসতে পারে। তাদের জন্য বিদেশে রোড শো করার চেয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা বেশি কার্যকর।’
১০-২০টি কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে একটি রোডম্যাপ করা যেতে পারে। এজন্য বিএসইসির পক্ষ থেকে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।’
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘অর্থনীতির পুনর্গঠন ও উন্নয়নে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বর্তমান জটিল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। শেয়ারের দাম নির্ধারণে বাজারশক্তিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার, মানি মার্কেট, কর, বীমা ও আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রকদের সমন্বিতভাবে বিধি সহজ করতে হবে।’
সভায় আরো বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন, সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার, সিএসইর পরিচালক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম, আইআইএবির প্রেসিডেন্ট মো. নুরুল আলম, বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী, বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলীহুসাইন আকবেরালী, চিটাগং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলীসহ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।










