বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও কৃষকদের কাছে সহজ, সাশ্রয়ী ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ সেবা পৌঁছে দেয়া। শাখার দূরত্ব, যাতায়াত ও সময়ের ব্যয়, জটিল প্রক্রিয়া এবং ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের কারণে এখনো বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময় গ্রাহক প্রচলিত ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। অথচ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ পরিচালিত হয় এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও গ্রামীণ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। এমন বাস্তবতায় এজেন্ট ব্যাংকিং শুধু লেনদেনের বিকল্প চ্যানেলই নয়; বরং এটি হতে পারে ব্যাংকের ঋণ ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি কার্যকর অবকাঠামো।
একটি নতুন শাখা স্থাপনের তুলনায় শক্তিশালী এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কম বিনিয়োগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের উপস্থিতি ও সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে অবস্থানের কারণে এজেন্টরা সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতা শনাক্তকরণ, আবেদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের পর গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারেন। ফলে গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছানোর ব্যয় কমিয়ে ছোট অংকের ঋণকেও ব্যাংকের জন্য অধিকতর অর্থনৈতিক ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়।
কেন ঋণ ব্যবসায় এজেন্ট নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যেসব ভৌগোলিক এলাকায় নতুন শাখা স্থাপন ও পরিচালনা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়, সেখানেও ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দেয়া যায়। একটি পূর্ণাঙ্গ শাখার জন্য অবকাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিপরীতে বিদ্যমান এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তুলনামূলক কম ব্যয়ে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব।
একই সঙ্গে স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও কৃষকদের কাছেও পৌঁছানো যায়, যারা হয়তো কখনো ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ঋণের আবেদন করার কথা ভাবেননি। তথ্যের অভাব, শাখার দূরত্ব, সময়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনভিজ্ঞতার কারণে সম্ভাবনাময় অনেক গ্রাহক ব্যাংক ঋণের বাইরে থাকেন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও সহজে পৌঁছানো যায় এমন এজেন্ট এ দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারেন।
ছোট অংকের ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক সংগ্রহ, প্রাথমিক যাচাই, ফলোআপ ও ঋণসেবা দেয়ার ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এজেন্ট নেটওয়ার্ককে এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে সেবা পৌঁছানোর ব্যয় কমানো সম্ভব। এতে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র গ্রাহককে সেবা দেয়ার একটি কার্যকর ও টেকসই মডেলও তৈরি হতে পারে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণসেবা সম্প্রসারণের অর্থ এজেন্টকে ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা দেয়া নয়। ঋণনীতি, গ্রাহকের সক্ষমতা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঋণের পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ এবং চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে হবে। এজেন্ট মূলত ব্যাংকের শক্তিশালী সার্ভিস ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করবেন।
ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণে সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত নির্দেশনা ও প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র এবং কৃষি ঋণে অধিকাংশ ব্যাংকের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর পেছনে রয়েছে ছোট অংকের ঋণের বিপরীতে তুলনামূলক বেশি পরিচালন ব্যয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর খরচ, নিয়মিত যাচাই ও মনিটরিংয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঋণ আদায়ের ঝুঁকি এবং প্রচলিত শাখাভিত্তিক মডেলে তুলনামূলক বেশি কস্ট টু সার্ভ। এ কারণে অনেক ব্যাংক সরাসরি ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণ দেয়ার পরিবর্তে এনজিও বা এমএফআইয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন করে। এতে ব্যাংক নির্ধারিত ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারলেও গ্রাহকের কাছে অর্থায়ন পৌঁছাতে একটি মধ্যবর্তী স্তর যুক্ত হয়। ফলে অর্থায়নের সামগ্রিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এখানেই এজেন্ট ব্যাংকিং বিকল্প মডেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিজস্ব এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্যাংক সরাসরি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারলে মধ্যবর্তী স্তরের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। ফলে সরাসরি, স্বচ্ছ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ীভাবে ব্যাংক ঋণ দেয়া সম্ভব।
এজন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবসায়িক কাঠামো। এজেন্টদের অতিরিক্ত দায়িত্বের বিপরীতে যথাযথ পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা না থাকলে মডেলটি টেকসই করা কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ২০২৫-২৬’-এ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট কমিশন বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে দশমিক ৫০ শতাংশ অনুমোদনের বিধান রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কাঠামো আরো বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষত ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক শনাক্তকরণ, আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা, তথ্য সংগ্রহ ও পরবর্তী ফলোআপের মতো অতিরিক্ত সেবার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত একটি নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ এজেন্ট ফি চালুর বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ধরনের ফি অবশ্যই ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামোর অধীনে, গ্রাহকের জন্য সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত সীমার মধ্যে প্রয়োগ করা উচিত। এর উদ্দেশ্য ঋণের খরচ অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো নয়; বরং ব্যাংক ও এজেন্ট উভয়ের জন্য এমন কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে আনুষ্ঠানিক ঋণ পৌঁছে দেয়া ব্যবসায়িকভাবে টেকসই হয়।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যাংকের হাতেই
এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ঋণ ব্যবসা সম্প্রসারণ মানে ক্রেডিট রিস্ক এজেন্টের হাতে তুলে দেয়া নয়। বরং প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর কেন্দ্রীয় ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এজেন্ট নেটওয়ার্ককে যুক্ত করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। এজেন্ট সম্ভাব্য গ্রাহক শনাক্ত, ঋণের আবেদন সংগ্রহে সহায়তা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঋণ বিতরণের পর ফলোআপ করতে পারেন। অন্যদিকে ঋণ মূল্যায়ন, ক্রেডিট স্কোরিং, ঝুঁকি নির্ধারণ, ঋণের পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ, অনুমোদন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্যাংকের নিজস্ব কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণের অধীনেই থাকতে হবে।
প্রযুক্তির অগ্রগতিও এ মডেলকে কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল আবেদন, ই-কেওয়াইসি, তথ্যভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কেন্দ্রীয় অনুমোদন ব্যবস্থা এবং রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার গ্রাহককে সেবা দিয়েও ঋণঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নজর রাখা সম্ভব।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরবর্তী অধ্যায়
এজেন্ট ব্যাংকিংকে শুধু নগদ টাকা জমা ও উত্তোলন, হিসাব খোলা বা সাধারণ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। এটিকে কাস্টমার অ্যাকুইজিশন, সার্ভিস ডেলিভারি, ডেটা কালেকশন এবং ক্রেডিট ডিস্ট্রিবিউশনের সমন্বিত অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আজ যে ক্ষুদ্র ঋণ—পরিচালন ব্যয় ও ঝুঁকির কারণে ব্যাংকের কাছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়; তা প্রযুক্তি, তথ্য ও শক্তিশালী এজেন্ট নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে আগামীতে বড় ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে। এতে ব্যাংকের ঋণ ব্যবসার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসবেন আরো বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও গ্রামীণ ব্যবসায়ী।
এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে চারটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—সঠিক নীতি, উপযুক্ত প্রযুক্তি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও টেকসই ব্যবসায়িক কাঠামো। পাশাপাশি গ্রাহকের স্বার্থ, ঋণের মূল্য এবং ভোক্তা সুরক্ষার বিষয়গুলোও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শক্তি এর স্থানীয় উপস্থিতিতে, আর প্রযুক্তির শক্তি দূরত্ব ও তথ্যের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনা। এ দুই শক্তিকে একত্র করা গেলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিক ঋণের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। সঠিক নীতি ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগে এজেন্ট ব্যাংকিং তাই শুধু ব্যাংকের নতুন ব্যবসায়িক চ্যানেল নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের অর্থায়নপ্রাপ্তির নতুন দরজা এবং বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী বড় অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা










