বর্ষা শুরু হলেই সঙ্গে আতঙ্ক নিয়ে হাজির থাকে ডেঙ্গু। এতে আক্রান্ত হলেও রোগীর পাশাপাশি পুরো পরিবার হেনস্তার শিকার হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে মুখোমুখি হতে হয় নানা হয়রানির। বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের দিকে লক্ষ করলে দেখব এটা কয়েকটি ধাপে আমাদের এখানে আঘাত হেনেছে। মোটা দাগে এটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গুর হানা ছিল ১৯৮০-এর দশকে। তারপর আঘাত হানে নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে এবং সর্বশেষ গত কয়েক বছর। এর মধ্যে গত বছর ডেঙ্গুতে রেকর্ড প্রাণহানি হয়। বারবার ডেঙ্গুর এ প্রত্যাবর্তনের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক নীতি গ্রহণ না করা। যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও বড় অংকের প্রাণহানি ঠেকানো যেত। 

সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বেড়ে যায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ। যখন তখন বৃষ্টির কারণে বর্ষাকালে আবহাওয়া সবসময় আর্দ্র থাকে। এ কারণে বর্ষাকালে বায়ুবাহিত, জলবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সবারই যত্নবান হতে হবে। আর বর্ষার মৌসুম শুরু হলেই ফ্লু-জাতীয় রোগব্যাধি বেড়ে যায়। প্রায় সব পরিবারেই এ সময় কেউ না কেউ সর্দি, কাশি, জ্বরে ভুগে থাকে। তার মধ্যে তিন বছর ধরে যুক্ত হয়েছে কভিড-১৯-এর ভয়। এ মৌসুমে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য মশাবাহিত রোগের উপদ্রবও বেড়ে যায়। ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপক প্রভাব ছিল গত বছর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাতে জানা গেছে, গত সোমবার ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে চার শতাধিক। স্পষ্টত গত বছরের ন্যায় এবারো ভয়াবহ রূপ নিয়ে ডেঙ্গু। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ থাকে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল এগিয়ে এসেছে এবং দীর্ঘায়িত হয়েছে। গত বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকসহ অনেকে মারাও গেছেন। তাই ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ছিল এবং আছে।

বর্ষা মৌসুম আসায় রাজধানী ঢাকায় আবার মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮ হাজার ৭৫৭ জন। তাদের মধ্যে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৪৮১ জন। আর ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ২৭৬ জন। অন্যদিকে, এ সময়ের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৭ হাজার ৩১৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৫ হাজার ৪৭৪ ও ঢাকার বাইরে ১ হাজার ৮৪৩ জন। আর এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশে মারা গেছে ৫২ জন। বিদায়ী বছরে (২০২২ সালে) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৮১ জন। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ডেঙ্গুতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ওই বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬২ হাজার ৩৮২ জন। ২০২০ সালে করোনা মহামারীকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১-এ সারা দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি পুনরাবির্ভূত রোগ হিসেবে গণ্য। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন মোতাবেক এ দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বিস্ফোরক পর্যায়ে আছে। গত বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুহার বা কেস ফ্যাটালিটি রেট (সিএফআর) শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ। সর্বোচ্চ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। মোট আক্রান্তের ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ ও মৃত্যুর ৬০ দশমিক ৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে ঢাকা। 

ডব্লিউএইচও ২০০০ সালের এক প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৮২-৮৩ সালের মধ্যে পরিচালিত ঢাকা মহানগরীর স্কুলের শিশুদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে মোট ২ হাজার ৪৫৬টি রক্তের নমুনার মধ্যে ২৭৮টিতে ডেঙ্গুর লক্ষণ ধরা পড়ে। ১৯৮৪-৮৬ সালে ঢাকা শহরের হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত রক্তের ২১টি নমুনার সবক’টিতেই সংক্রমণের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য আসা প্রায় ১১ শতাংশ রোগীর (২৫০ জনের মধ্যে ২৭ জন) মধ্যে ডেঙ্গু অ্যান্টিজেনের পজিটিভ অ্যান্টিবডি টাইটার ধরা পড়েছিল। ১৯৯৯ সালে ঢাকার মহাখালীর স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে, বিভিন্ন জেলা থেকে পাঠানো সন্দেহজনক রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ২৪১টির মধ্যে ৯৮টিতে ডেঙ্গুর অস্তিত্ব পেয়েছিল। ওই ইনস্টিটিউট প্রদত্ত বিস্তারিত তথ্যে এগুলোর মধ্যে কয়েকটি রক্তক্ষরা ডেঙ্গুরও তথ্য ছিল। ঢাকা শহরের চিকিৎসকদের দেয়া তথ্য থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রক্তক্ষরা ডেঙ্গুর অস্তিত্বের কথা জানা গেছে।

২০১৯ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। ওই বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখেরও বেশি। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত রোগী কখনই হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। এমনকি এ সংখ্যা গত ১৯ বছরে দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে দেশে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। 

২০০২ সালে দেশে প্রথম ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু রোগী দেখা যায়। সে সময় ৫ হাজার ৫১১ রোগী ভর্তি হয়েছিল। ২০০১ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমলেও ২০০২ সালে রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে ক্রমান্বয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ডেঙ্গু প্রধানত এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার একটি ভাইরাসঘটিত সংক্রামক ব্যাধি। ডেঙ্গু ভাইরাস গোত্রভুক্ত, যার প্রায় ৭০ ধরনের ভাইরাসের মধ্যে আছে ইয়োলো ফিভার ও কয়েক ধরনের এনসেফালাইটিসের ভাইরাস। 

ডেঙ্গু জ্বরের অনুরূপ একটি রোগের মহামারীর প্রথম তথ্য পাওয়া যায় ১৭৭৯ ও ১৭৮০ সালে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বই-পুস্তকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলকাতায় প্রথম ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত হয়। ১৮৭১-৭২ সালে এ রোগ মহামারী আকারে দেখা দেয়। ওই সময় থেকে রোগটির প্রকোপ এ উপমহাদেশে প্রায়ই ঘটে। ১৯৩৯-৪৫ সাল থেকে গোটা মহাদেশে ১০ থেকে ৩০ বছর পর পর ডেঙ্গু জ্বর দেখা দিতে থাকে। কোনো একটি বিশেষ স্থানে বারবার ডেঙ্গুর মহামারী দেখা দিত না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বহু ডেঙ্গু ভাইরাস সেরোটাইপের সহসঞ্চালন দেখা দেয় এবং মহামারীর ঘটনা বৃদ্ধি পায়। ক্যারিবীয় অঞ্চল (১৯৭৭-১৯৮১), দক্ষিণ আমেরিকা (১৯৮০ সালের শুরুতে), প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (১৯৭৯) ও আফ্রিকায় ব্যাপক আকারে ডেঙ্গু মহামারী দেখা দেয় যাতে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়। রক্তক্ষরা ডেঙ্গু জ্বর এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৯৫৩-৫৪ সালে ম্যানিলায় এবং ১৯৭৫ সালের মধ্যে নিয়মিত বিরতিসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে। ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালে মহামারী আকারে রক্তক্ষরা ডেঙ্গু ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও পূর্বদিকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তক্ষরা ডেঙ্গু জ্বর ও শক সিনড্রোম এখন এশিয়ায় হাসপাতালে ভর্তি ও শিশুমৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। ডেঙ্গু জ্বরের বাহক মশা চার ধরনের। ডেঙ্গু ভাইরাস (১-৪) হলো ডেঙ্গু ও রক্তক্ষরা ডেঙ্গুর কারণ। যে কোনো একটি সেরোটাইপ বিশেষ কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়, কিন্তু অন্য ভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে নয়। উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় শহরাঞ্চলীয় চক্রেই ডেঙ্গু ভাইরাস স্থিতি লাভ করে। এজন্যই শহুরে লোকদের মধ্যেই রোগটি বেশি। মানুষের আবাসস্থল সংশ্লিষ্ট দিনের বেলায় দংশনকারী মশা এসব ভাইরাসের বাহক। কোনো কোনো অঞ্চলে অন্যান্য প্রজাতির মশাও সংক্রমণ ঘটায়। রোগীকে দংশনের দুই সপ্তাহ পর মশা সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠে এবং গোটা জীবন চক্রেই সংক্রমণশীল থাকে।

ডেঙ্গু অনেকটা স্থানিক মহামারীর রূপ নিয়েছে। শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ এতে মারা যাচ্ছে। আক্রান্তরা বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছে। সীমিত কিছু হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগী গ্রহণে অনীহা প্রদর্শন করে। বর্তমানের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় বিশেষ ইউনিট বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যমান হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু ইউনিট স্থাপন আবশ্যক। জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেয়া চাই। সরকার ও জনগণের সম-অংশগ্রহণ এ সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: চিকিৎসক ও কলাম লেখক