বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বছরে ৯০০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৬০ বিলিয়ন পাউন্ড) অর্থ বরাদ্দ করা সম্ভব হবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে জমা দেয়া একটি নতুন প্রতিবেদনে এ দাবি করেছে নরওয়ে সরকারের সহায়তায় অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ইন্টারন্যাশনাল’ (ডিএফআই)। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বুধবার অসলোয় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, ঋণঘটিত উন্নয়ন সংকটের দিক থেকে বিশ্ব এখন সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জি৭৭ জোটভুক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতি বছর তাদের ঋণ পরিশোধে মোট ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এটি দেশগুলোর গড় সরকারি ব্যয়ের ৩৫ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের ৬০০ কোটি মানুষ এমন সব দেশে বসবাস করছেন যেখানে স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক বাজেটের চেয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যয় বেশি হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সম্পদ সাশ্রয় করতে বৈশ্বিক ঋণ মওকুফের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে তিনি চরম সংকটে থাকা দেশগুলোর ঋণ পুনর্গঠন এবং আর্থিক বাজার থেকে ঋণ নেয়ার খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে ডিএফআই প্রতিটি দেশের জন্য আলাদাভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুফলগুলো তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সুদ দেয়া ৩৩টি দেশের ঋণের খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনা ও জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের কিস্তি সরকারি রাজস্বের ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বছরে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব।

চীনসহ অপেক্ষাকৃত ধনী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাদ দিয়ে যদি আরো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা হয়, তাহলেও বছরে ৯১৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। এতে দেশগুলো তাদের সামাজিক খাতের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে পারবে। গড়ে এ সাশ্রয় সুবিধাভোগী দেশগুলোর বার্ষিক জিডিপির ৯ শতাংশের সমান হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এ ঋণ মওকুফ নিশ্চিত করতে পারে, তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সম্ভব হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ‘মেক পভার্টি হিস্ট্রি’ ক্যাম্পেইনের সময়ের তুলনায় বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের বোঝা অনেক বেশি। সে সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জি৮ সম্মেলনে ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আগামী বছর যুক্তরাজ্য জি২০-এর সভাপতিত্ব করবে, তাই উন্নয়নকর্মীরা বর্তমান লেবার সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছেন যাতে তারা এ ঋণ কমানোর সুযোগটি কাজে লাগায়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এখন সরাসরি সরকারি ঋণের চেয়ে বেসরকারি খাতের (যেমন হেজ ফান্ড) ঋণের পরিমাণ বেশি। আইএমএফ সতর্ক করেছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ এবং মুদ্রার অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ইরান যুদ্ধের ফলে তেলের সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে ঋণের খরচ আরো বেড়েছে। আগামী মাসগুলোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এই ঋণের বোঝা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।