একই সঙ্গে নিজেদের বহরের কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই এলএনজি রফতানিকারক।

বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ থেকে কাতার এনার্জি ধরে নিচ্ছে যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে এবং দেশটির এলএনজি রফতানি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরতে আরো সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) একজন কর্মকর্তাসহ বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য এলএনজি সরবরাহে ঘোষিত ফোর্স ম্যাজিউরের মেয়াদ বাড়িয়েছে কাতার এনার্জি। একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যেসব নোটিসের মেয়াদ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান রয়টার্সকে বলেন, ‘কাতারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। আমাদের তুলনামূলক ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে জিটুজিসহ অন্যান্য সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা অনিবার্যভাবে বাড়বে।’

বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট আরো দুটি সূত্র জানিয়েছে, কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউরের মেয়াদ আরো বাড়িয়ে অক্টোবর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে বলে তারা ধারণা করছে। সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় সূত্রগুলো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স যোগাযোগ করলেও কাতার এনার্জির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইরান যুদ্ধের কারণে কাতার এনার্জিকে এরই মধ্যে এলএনজি উৎপাদনের কয়েকটি লিকুইফ্যাকশন ট্রেন বন্ধ করতে হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত চালান দিতে না পারায় ক্রেতাদের কাছে ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা এবং রফতানি স্থগিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কোনো প্রতিষ্ঠান তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের কারণে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে সাধারণত ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করে।

চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি ট্যাংকারে ইরানের নতুন করে হামলার পর কাতারের এলএনজি রফতানি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই কাতার সরবরাহ করে। ফলে দেশটির রফতানি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি দামও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধে শীতের মৌসুম সামনে রেখে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে কাতার এনার্জির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি এলএনজি মার্কেটিং এবং কাতার এনার্জি ট্রেডিং তাদের কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ অক্টোবর পর্যন্ত ভাড়ায় দেয়ার প্রস্তাব অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছেন দুই জাহাজ ব্রোকার। কাতার এনার্জির বর্তমান পরিচালনাধীন বহরে প্রায় ৭০টি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে অল্প কয়েকটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ভাড়া দেয়া হলেও বাণিজ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ৩০ থেকে ৯০ দিনের স্পট চুক্তিতে জাহাজগুলো ভাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি রফতানি বিঘ্নের প্রত্যাশাই নির্দেশ করছে।

জ্বালানি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির গবেষণা পরিচালক ইকরাম এলৌমি বলেন, সাম্প্রতিক চুক্তির তথ্য অনুযায়ী, কাতার এনার্জি এলএনজি মার্কেটিং ও কাতার এনার্জি ট্রেডিংয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্তত নয়টি এলএনজিবাহী জাহাজ তৃতীয় পক্ষের কাছে সাব-চার্টার করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শেভরন, বিপি, এনবিডব্লিউ, চেনিয়ার, কানসাই, সকার, এলএমসিএস ও ট্রাফিগুরা। বিপি দুটি জাহাজ ভাড়া নিয়েছে।

দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়া এলএনজি জাহাজ পরিবহন বাজারে ভাড়া কমে যাওয়ার মধ্যেও কাতার এনার্জি এসব জাহাজ ভাড়া দিয়েছে। এলৌমির মতে, ভাড়া কমার পরও জাহাজ ব্যবহারের চুক্তি করার আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় না থেকে কাতার এখন বহরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

কাতারি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চালান না এলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের গ্যাস চাহিদা মেটাতে স্পট বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হবে। এতে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।